শিশুকে ধর্ষণ থেকে রক্ষা করতে না পারা রাষ্ট্র সিনেমা বন্ধে এত সক্রিয় কেন: রুমিন ফারহানা
মানববন্ধন কর্মসূচিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক ও নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ২০:১৪
কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের বাধার মুখে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেছেন, যে রাষ্ট্র ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও বলাৎকার থেকে রক্ষা করতে পারে না, যে রাষ্ট্র দুর্নীতি, অর্থপাচার কিংবা ব্যাংক লুট বন্ধ করতে ব্যর্থ, সে রাষ্ট্র কেন একটি সিনেমা বন্ধ করার ক্ষেত্রে এতটা সক্রিয়।
সোমবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ যেমন কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা দলের ছিল না, তেমনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশের কোনো গণআন্দোলনকে কেউ কুক্ষিগত করতে চাইলে তার পরিণতি ভালো হবে না। বাংলাদেশে সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে। ২০২১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গনে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোনও সিনেমা হল নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোনও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে দাঁড়াতে দেওয়া হয় না। এ কালো নকশা কারা করছে। যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে বিশ্বে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে চায় তারাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যে রাষ্ট্র ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও বলাৎকার থেকে রক্ষা করতে পারে না, যে রাষ্ট্র দুর্নীতি, অর্থপাচার কিংবা ব্যাংক লুট বন্ধ করতে ব্যর্থ, সেই রাষ্ট্র কেন একটি সিনেমা বন্ধ করার ক্ষেত্রে এতটা সক্রিয়।
রুমিন ফারহানা বলেন, বনলতা এক্সপ্রেস একটি পারিবারিক চলচ্চিত্র। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসে দেখার মতো একটি সিনেমা। তাহলে সেটি কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো। এই প্রশ্নের উত্তর আজও মানুষ খুঁজছে। গত দুবছরে দেশে একের পর এক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সহনশীলতার সংকট দেখা দিয়েছে। আমরা দেখেছি মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে লাশ তোলে পোড়ানো হয়েছে, উগ্রপন্থার উত্থান ঘটেছে। অথচ বাংলাদেশের চিরায়ত পরিচয় এমন ছিল না। এই দেশে যেমন মসজিদ থেকে আজানোর সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসে, সকালে কোরআনের তেলওয়াতের ধ্বনি শোনা যেত, তেমনি বিকেলে শিশুদের হারমোনিয়ামে গান শেখার সুর ভেসে আসত। এটাই ছিল বাংলাদেশের সৌন্দর্য।
মানববন্ধনে তিনি বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও চলচ্চিত্রচর্চা সববসময়ই বাংলাদেশের সমাজকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু এখন কিছু গোষ্ঠী বাংলাদেশকে সংকীর্ণ চিন্তার দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনিসংকেত।
এতে আরও বক্তব্য দেন জেলা উদীচীর সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস রহমান, সরাইল উদীচীর সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল পাঠান, সোনালী সকালের সভাপতি ফাহিম মুনতাসির এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিফতি আল জাবেদ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে গত শনিবার জেলা শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মিলনায়তনে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনের কথা ছিল। তবে কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিরোধিতা করে বিভিন্ন পোস্ট দেওয়ার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হল ব্যবহারের অনুমতি বাতিল করে।
পরবর্তী সময়ে আয়োজকদের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামলের আলোচনার পর চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এক বিবৃতিতে আয়োজকরা পরে নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে জানান।
এদিকে কসবা উপজেলার পৌর এলাকার তালতলা গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই দিন চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী শুরুর ১৫ মিনিট আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলিশ নিয়ে গিয়ে প্রদর্শনী বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ১০টি সাংস্কৃতিক সংগঠন যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়া এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত একটি দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতার পরিচয়। একই সঙ্গে তারা কসবার ঘটনাকে ‘অতিউৎসাহী আচরণ’ আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানায়।
বিবৃতি দেওয়া সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে অনুশীলন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সংসদ, জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখা, জেলা খেলাঘর, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, সোনালী সকাল, চারণ, অক্ষর আলাপন, কবির কলম ও আমাদের সংস্কৃতি।
