‘কুমিরে আমার বাচ্চা খাইছে আমারেও খাইয়া ফেলুক’
বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাগেরহাটে হজরত খান জাহান আলীর (রহ.) মাজার দিঘিতে গত সোমবার রাতে কুমিরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সাত বছরের ফাতেমাকে। পরদিন পাওয়া যায় শিশুটির মরদেহ। মেয়ে হারানোর এ ঘটনায় সামনে এসেছে তার মা ফজিলা খাতুনের জীবনের গল্প। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে ময়মনসিংহের বাবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফাতেমাকে নিয়ে নিখোঁজ হন তিনি। অবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁকে স্বজনের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে।
ফজিলার বাড়ি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর হরিচাঁদ গ্রামে। তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে ঝড়-বৃষ্টির এক দিনে ছোট মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর দুজনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ফজিলা মেয়ে ফাতেমাকে নিয়ে বাগেরহাটের এই মাজার এলাকায় বসবাস করছিলেন। স্থানীয়রা তাঁকে চিনতেন ‘ফাতেমার মা’ নামে। কেউই প্রকৃত পরিচয়
জানতেন না। গত সোমবার রাতে দিঘিতে কুমিরে টেনে নেয় ফাতেমাকে। মঙ্গলবার ভোরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গত বুধবার কুমিরটিকেও সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ-সংক্রান্ত খবর ও ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বুধবার সেগুলো ফজিলার পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। ছবি দেখে তারা নিশ্চিত হন, নিহত শিশুটি ফাতেমা ও তাঁর সঙ্গে থাকা নারীটি নিখোঁজ ফজিলা। এরপরই পরিবারের সদস্যরা ময়মনসিংহ থেকে বাগেরহাট রওনা দেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মাজার এলাকায় এসে তাঁরা ফজিলাকে খুঁজে পান। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে তিনি খাবার খান। ফজিলার ভাই হারেজ আলী বলেন, সকালে দেখেন তাঁর বোন মাজারের পূর্ব পাশে একটি ঘরের সঙ্গে হেলান দিয়ে শুয়ে আছেন। তাঁকে দেখে উঠে বসেন। পরে তাঁকে ফাতেমার কবরের কাছে নিয়ে যান। তখন ফজিলা শুধু বলছিলেন, ‘কুমিরে আমার বাচ্চারে খাইছে। কুমির আমারেও খাইয়া ফেলুক। আমি মাইয়ারে ছাইড়া যামু না।’
ফজিলার মা হাজেরা খাতুন বলেন, তাঁর ছয় সন্তানের মধ্যে ফজিলা বড়। তাঁকে দেখে ফজিলা বলছিলেন, ‘আমার মেয়েরে না দিলে আমি যামু না।’ নাতনির জন্য মন কাঁদে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আমিই তাকে মানুষ করেছি।’
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, পরিবারের দেওয়া তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই করেন তারা। পাশাপাশি ময়মনসিংহে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। সবকিছু যাচাইয়ের পর ফজিলা খাতুনকে তাঁর পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
কুমির সরিয়ে নেওয়ায় খাদেমদের ক্ষোভ
এদিকে মাজারসংলগ্ন দিঘিতে থাকা একমাত্র কুমির সরিয়ে নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবস্থাপনায় থাকা খাদেমরা। বুধবার দুপুরে প্রশাসনের সহযোগিতায় বন বিভাগ দিঘি থেকে কুমিরটি সরিয়ে নেয়। সেটি এখন খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে আছে।
এ বিষয়ে মাজারের প্রধান খাদেম ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘খানজাহান আলীর (রহ.) মাজার এবং এই দিঘি সাড়ে ৫০০ বছর ধরে আমাদের পরিবার এবং আমরা দেখভাল করে আসছি। হ্যাঁ, আমাদের ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। এটা (কুমির) বাগেরহাটের মানুষের একটা সম্পদ। দুর্ঘটনা যেকোনো জায়গায় হতে পারে। তাই বলে কুমিরটি নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।’
- বিষয় :
- কুমির
