নদী খননের মাটি আশ্রয়ণে, বাস্তুহারা বহু মানুষ
ডুমুরিয়ায় কাঠালতলা ভদ্রা নদী খননের মাটি ফেলা হয়েছে আবাসন প্রকল্পের ঘরের ওপর সমকাল
ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ | ১০:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই খেলার মাঠ। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হবে এ যেন অস্থায়ী কোনো শ্রমিক শিবির। কাছে গেলে দেখা যায়, পুরনো টিন আর পলিথিন দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। রোদ-বৃষ্টির মধ্যে এখানেই দিন কাটাচ্ছেন শত শত মানুষ। অথচ সাড়ে চার মাস আগেও তাদের স্থায়ী ঠিকানা ছিল ভদ্রা নদীর চরে গড়ে ওঠা আশ্রয়ণ প্রকল্পে। এখন সেই ঘর নেই, আছে শুধু স্মৃতি। পুনর্বাসনের অপেক্ষায় থেকে প্রহর গুনছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয়দের দাবি, নদী খনন প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ হওয়া অন্তত ১৪৩টি পরিবার এখন বাস করছে খোলা জায়গায়। নদী খননের মাটির চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁঠালতলা বাজার এলাকার আরেকটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের অন্তত ৯টি ঘর।
চুকনগর বাজারের পাশের অস্থায়ী বসতিতে দেখা হয় সহিদুল গাজীর সঙ্গে। সমকালকে তিনি জানান, উচ্ছেদের আগে পর্যাপ্ত সময় বা বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা ছিল না। ঘর ভাঙার পর মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। টিন আর পলিথিন দিয়ে ঝুপড়ি ঘর তৈরি করেছেন। দিনে প্রচণ্ড রোদে থাকা যায় না, আবার বৃষ্টি হলে পানি ঢুকে যায় ঘরে। রোহিঙ্গারাও তাদের চেয়ে ভালো আছেন।
একই রকম আক্ষেপ কল্যাণী সরকারের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের নামে দুই শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছিল। সে ঘরেই থাকতাম সাতজন। এখন থাকতে হচ্ছে মাঠে। বিদ্যুৎ নেই, বিশুদ্ধ পানিও নেই। শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ঘর ভাঙার সময় বলা হয়েছিল পুনর্বাসন করা হবে দ্রুত; কিন্তু এখনও কিছুই হয়নি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভদ্রা নদীর চরের চুকনগর অংশে ১৪৫টি এবং কাঁঠালতলা-বরাতিয়া অংশে ১২৪টি ঘর নির্মাণ করেছিল সরকার। সাড়ে ছয় মাস আগে ভদ্রা নদী খনন শুরু হওয়ায় চুকনগর অংশে উচ্ছেদ করা হয় ১৪৩টি ঘর। বর্তমানে সেখানে অক্ষত আছে মাত্র দুটি ঘর।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দিন বলেন, ভদ্রা নদীর চরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিকল্পনাগত ত্রুটির ফলেই সৃষ্টি হয়েছে এই পরিস্থিতি।
চুকনগর ওয়ার্ডের সদস্য আলাউদ্দীন মাঝির ভাষ্য, সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে ঘর নির্মাণ করেছে, কিন্তু নদীর মাঝখানে প্রকল্প করায় এখন পড়েছে প্রশ্নের মুখে।
চুকনগরে উচ্ছেদের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন সংকটে পড়েছেন কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। নদী খনন করে তোলা বিপুল পরিমাণ মাটি ঘরগুলোর পাশে রাখা হয়েছে স্তূপ করে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেই মাটির চাপেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৯টি ঘর।
বর্ষা শুরু হওয়ার পর মাটির স্তূপ ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন আশঙ্কা। স্থানীয় বাসিন্দা রোজিনা বেগম জানান, নদী খননের মাটি পাহাড়ের মতো উঁচু করে রাখা হয়েছে। বৃষ্টির সময় সেই মাটি ধসে তিন বছরের এক শিশু চাপা পড়েছিল। পরে আশপাশের লোকজন উদ্ধার করায় বেঁচে যায় শিশুটি।
এসব ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ডুমুরিয়া উপজেলার নদী পুনর্খননের মাটি ফেলার কারণে উচ্ছেদ হয়েছে দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। তাদের অনেকের দিন কাটছে আতঙ্কে। এই অবস্থায় ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ঘরগুলো মেরামত বা পুনর্নিমাণ এবং নলকূপ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরায় স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, খুলনা ও যশোর অঞ্চলে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খননকাজ চলছে।
যশোর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জীর ভাষ্য, প্রকল্পে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের জন্য নেই অর্থ বরাদ্দ। এ কারণে প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসন সম্ভব নয়। তিনি জানান, বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে রাখা মাটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামত করা হচ্ছে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায়।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা; কিন্তু ডুমুরিয়ার চুকনগরে সেই প্রকল্পের বাসিন্দাদেরই এখন খোলা মাঠে আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
বিষয়টি বহুবার প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দীন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রায় এক হাজার মানুষ বাস করছে খোলা জায়গায়। বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, খাবারের কষ্টও আছে তাদের।
অবশ্য বরাতিয়া প্রকল্পে জমে থাকা মাটি সরিয়ে নেওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার। চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এখনও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।