চেরাপুঞ্জির ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল, প্লাবিত সুনামগঞ্জের অর্ধশতাধিক গ্রাম
পাহাড়ি ঢলে তাহিরপুর সীমান্তের চারগাঁও শুল্কস্টেশন এলাকার বাসিন্দারা চরম বিপাকে পড়েছেন। ছবি- সমকাল
সুনামগঞ্জ ও তাহিরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ১৯:১০
ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, দোকানপাট ও কয়লা ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাহিরপুর উপজেলার চারাগাঁও সীমান্ত এলাকায়।
আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় চেরাপুঞ্জিতে ৩৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর প্রভাবে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, সদর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে ব্যাপক ঢলের পানি প্রবেশ করেছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, শনিবার সকাল ৯টা থেকে রোববার বিকেল ৩টা পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি ৮৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পানি বাড়ার প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সদর উপজেলার উত্তর সুরমা এলাকার বড়বাজার-মঙ্গলকাটাসহ বিভিন্ন স্থানে ঢলের পানি প্রবেশ করায় ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মঙ্গলকাটা বাজারের ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, আকস্মিক ঢলে অনেক দোকানের মালামাল নষ্ট হয়েছে, বিশেষ করে ভূষিমালের ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দোয়ারাবাজার উপজেলার খাসিয়ামারা নদীতেও পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
তাহিরপুরের লাউড়েরগড় থেকে বাগলিছড়া পর্যন্ত সীমান্তজুড়ে অসংখ্য স্থান দিয়ে পাহাড়ি ঢল নামছে। চারাগাঁও ছড়া ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি সীমান্তঘেঁষা বাঁশতলা, চারাগাঁও, মাঝহাটি, জঙ্গলবাড়ি, সংসারপাড়, কলাগাঁও, বাজারহাটি ও লালঘাটসহ বিভিন্ন গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ঢলের পানিতে চারাগাঁওয়ের শতাধিক কয়লা ডিপো প্লাবিত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ কয়লা ভেসে গেছে এবং অনেক পাথরের স্তূপ বালুর নিচে চাপা পড়েছে। বাড়িঘর প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি পুকুরের মাছও ভেসে গেছে। প্রবল স্রোতে হাওরবাংলা স্কুলের সীমানা প্রাচীর ভেঙে পড়েছে।
চারাগাঁও শুল্ক স্টেশনের সচিব আশরাফুল ইসলাম আকাশ বলেন, হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্তবর্তী ৭-৮টি গ্রামের মানুষ গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।
এদিকে পাহাড়ি ঢলের কারণে তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের আনোয়ারপুর-শক্তিয়ারকলা অংশ প্রায় দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
যাদুকাটা, মাহারাম, রক্তি ও পাটলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় তাহিরপুর উপজেলার ৫০টিরও বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে নদী থেকে বালি ও পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। একইভাবে কয়লা ডিপো প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের কাজ বন্ধ রয়েছে।
দক্ষিণ শ্রীপুর, উত্তর শ্রীপুর, দক্ষিণ বড়দল, বাদাঘাট ও বালিজুড়ি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।
বালিজুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন বলেন, ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ সড়ক ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেহেদী হাসান মানিক জানান, সড়কের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, আগামী তিনদিনও বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে নদ-নদীর পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। তবে আপাতত বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।
