পুষ্টিহীনতা, রোগে-শোকে ভুগছে চা বাগানের নতুন প্রজন্ম
সবুজের আড়ালে ধূসর শৈশব
চুনারুঘাট উপজেলার নালুয়া চা বাগানের পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত শিশু। ছবি: সমকাল
মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০৮:০০
মাইলের পর মাইল ঢাল, টিলাজুড়ে বিস্তৃত চা বাগানের সবুজে মোড়ানো, প্রকৃতির মায়াবী আঁধার মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা। তবে এ প্রাণবন্ত সবুজ যাদের ছোঁয়ায় জাগ্রত। তাদের ঘরে ঘরে ধূসর, বিবর্ণ আগামী। অপুষ্টি আর স্বাস্থ্যহীনতায় থাকায় চা বাগানের শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন নিয়ে উৎকণ্ঠিত সচেতন মহল।
চা বাগানের এ সবুজ নান্দনিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘস্থায়ী ও নীরব সংকট। বিশেষ করে হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার ২৩টি চা বাগানে বেড়ে ওঠা হাজারো শিশুর পুষ্টির চাহিদাপূরণে এখনও বিশেষ অগ্রগতি নেই। তীব্র অপুষ্টি, দারিদ্র্য ও নামমাত্র স্বাস্থ্যসেবায় দিন পাড় করছে বাগান এলাকার অধিকাংশ শিশু।
স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়া তথ্য বলছে, চা শ্রমিকদের নিম্ন আয় তাদের সন্তানদের পুষ্টিহীনতার প্রকোপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব, নিম্ন আয় এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবক, শ্রমিক নেতা ও স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার নালুয়া, বৈকুণ্ঠপুর, হাতিমারা ও জগদীশপুরসহ কয়েকটি চা বাগান ঘুরে শিশুদের অপুষ্টির ভয়াবহ চিত্র চোখে পড়ে। বহু শিশুর শরীরেই পুষ্টিহীনতার লক্ষণ স্পষ্ট– বয়স অনুযায়ী ওজন ও উচ্চতা কম, শারীরিক দুর্বলতা, ঘনঘন অসুস্থ হয়ে পড়া এবং তীব্র রক্তস্বল্পতা। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ দিনের বংশানুক্রমিক দারিদ্র্য ও খাদ্য বৈচিত্র্যের অভাবই এর প্রধান কারণ। নালুয়া চা বাগানের শ্রমিক সমীর তন্তুবায় বলেন, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে যে মজুরি পান তা দিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানোই দায়। সন্তানের পুষ্টির চাহিদাপূরণে বাড়তি কিছুর যোগান দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। নিয়মিত দুধ, ডিম, মাছ বা ফলমূল খাওনোর সামর্থ্য তাদের নেই। ফলে তারা পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
হাতিমারা চা বাগানের শ্রমিক অমরি চাষা জানান, শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ এখানে সীমিত। টাকা-পয়সার অভাবে অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করে, যার ফলে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রথম স্বাস্থ্য জরিপ এবং মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চা বাগান এলাকার জনস্বাস্থ্যের চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
অতিসাম্প্রতিক সূচকে দেখা যায়, চা বাগান এলাকার শিশুদের খর্বকায় হওয়ার হার শতকরা ৪৫ ভাগ, শীর্ণকায় হওয়ার হার শতকরা ২৭ ভাগ, স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭ দশমিক পাঁচ ভাগ, ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা বঞ্চিত পরিবার শতকরা ৬৭ ভাগ, বাল্যবিয়ে শতকরা ৪৬ ভাগ যা মাতৃকালীন জটিলতা বাড়াচ্ছে।
শৈশব থেকে পুষ্টিহীনতায় বেড়ে ওঠা বাগানের বাসিন্দাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও কম। প্রায় তারা মারাত্মক সব রোগে আক্রান্ত হন। যার মধ্যে শতকরা ২২ ভাগ যক্ষ্মা ও কুষ্ঠরোগ। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জেলায় মোট শনাক্ত হওয়া ১৯ হাজার ৯১৪ জন যক্ষ্মা রোগীর মধ্যে সাত হাজার ২২০ জনই চা বাগানের বাসিন্দা।
কুষ্ঠরোগের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। এ চার বছরে জেলায় মোট ৭৬১ জন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়, যার মধ্যে ৬৩১ জনই চা বাগানের বাসিন্দা– যা মোট আক্রান্তের শতকরা ৮৩ ভাগ। চা শ্রমিক নেত্রী খাইরুন আক্তার এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়ে বলেন, শুধু কাগজে-কলমে প্রকল্প নিলেই হবে না, তা মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুপুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, বাগান কর্তৃপক্ষ এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এক টেবিলে এসে কাজ করতে হবে।
মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইমরুল হাসান জাহাঙ্গীর জানান, অপুষ্টি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। চা বাগান এলাকায় গর্ভবতী মা ও শিশুদের পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে, তবে এতে পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন এবং বাগান কর্তৃপক্ষের যৌথ অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক জি এম সরফরাজ এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, চা বাগান এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ আরও বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চা বাগানের প্রতিটি শিশুই দেশের সম্পদ। তাদের সুস্থ ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পুষ্টি, উন্নত স্যানিটেশন ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে চা বাগানের এ বিপুল শিশু ও তরুণ সমাজ দেশের টেকসই উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
- বিষয় :
- হবিগঞ্জ