ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

বগুড়ার সারিয়াকান্দি

যমুনা গিলেছে স্কুল, বাঁধে পাঠদান

শতবর্ষী চকরতিনাথ স্কুল ষষ্ঠবারের মতো বিলীন হয় গত মাসে

যমুনা গিলেছে স্কুল, বাঁধে পাঠদান
×

সারিয়াকান্দির চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যমুনার অব্যাহত ভাঙনের শিকার। বর্তমানে বাঁধে অস্থায়ীভাবে স্কুল গড়ে তুলে চলছে পাঠদান কার্যক্রম - সমকাল

লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ | ১১:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বৃষ্টি হলেই টিনের চাল চুইয়ে পানি পড়ে বই-খাতার ওপর। বাতাসের ঝাপটায় গা ঘেঁষে বসে থাকে শিশুরা। সামনে শিক্ষক পড়াচ্ছেন, আর কয়েকশ গজ দূরে গর্জন তুলছে যমুনা। নেই কোনো পাকা ভবন, আলাদা শ্রেণিকক্ষ। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে খুঁটি পুতে ওপরে টিনের চাল দিয়ে গড়ে তোলা অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে চলে পাঠদান। পাশে নেই কোনো বেড়া।

এটি ১০৭ বছরের পুরোনো চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা। শুধু এই বিদ্যালয়ই নয়, বগুড়ার সারিয়াকান্দির যমুনার পারজুড়ে নদীভাঙনে ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে শিক্ষার মানচিত্র। ভিটেমাটি হারিয়ে এলাকা ছাড়ছে পরিবার। ফাঁকা হচ্ছে শ্রেণিকক্ষ। শিক্ষক ও অভিভাবকরা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যমুনা শুধু জমি নয়, একটি প্রজন্মের শিক্ষার সুযোগও গিলে খাবে।

সারিয়াকান্দির যমুনা তীরবর্তী চকরতিনাথ গ্রামে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। যমুনার অব্যাহত ভাঙনের কাছে বারবার পরাস্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গত ১৬ মে বিদ্যালয় ভবন ষষ্ঠবারের মতো নদীগর্ভে বিলীন হয়। এক সময় এখানে ৪৮২ শিক্ষার্থী ছিল। আশপাশের গ্রামগুলো ছিল জনবহুল। কিন্তু বছরের পর বছর নদীভাঙনে মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যালয়ে। বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা নেমে এসেছে ৭৪ জনে। শিক্ষক আছেন ছয়জন। দুজন প্রশিক্ষণে থাকায় বর্তমানে চারজন মিলে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। 

বাঁধে অস্থায়ীভাবে গড়ে তোলা এই স্কুলে পৌঁছানোই শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী দিপু বাবু প্রতিদিন সুজাতপুর চর থেকে আধাঘণ্টা হেঁটে ঘাটে আসে। এরপর নৌকায় নদী পার হয়ে আরও প্রায় ২০ মিনিট হাঁটতে হয়। দিপু বলে, স্কুলটা যদি ভালো জায়গায় থাকত, তাহলে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারতাম। খেলাধুলাও করতে পারতাম। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়াকে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট হেঁটে চরের পথ পাড়ি দিতে হয়। এরপর খেয়া নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ঝড়-বৃষ্টি হলে কিংবা নৌকা না পেলে ফিরে যেতে হয় বাড়ি। 

বাঁধের ওপর ফেলে রাখা স্কুলের সরঞ্জাম

বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পর শিক্ষকরা নিজেদের অর্থ দিয়ে বাঁধে টিনের চালা তৈরি করেছেন। সেখানেই চলছে পাঠদান। বিদ্যালয়টি নতুন স্থানে স্থানান্তরে ৮০ হাজার টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তারা। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিন্নাহ আলম বলেন, আমি ১০ বছরের মতো এই বিদ্যালয়ে কর্মরত। আমার চোখের সামনেই বিদ্যালয়টি পাঁচবার নদীতে গেছে। এবার নিয়ে ষষ্ঠবার হলো। নতুন জায়গায় মাটি ভরাট ও ঘর নির্মাণের জন্য সরকারি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনও পাইনি। শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি কমাতে নিজেদের অর্থেই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি।

সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টি শুরু হলেই সমস্যা হয়। টিনের চালা দিয়ে পানি পড়ে। বাচ্চারা ভিজে যায়। তখন পাশের কোনো বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দিতে হয়। বৃষ্টি থামলে আবার ক্লাস শুরু করি। 

সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীভাঙনের কারণে শিক্ষাব্যবস্থা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন জানান, এবার কামালপুর, হাটশেরপুর, শিমুলতাইড়, হাসনাপাড়া, ইছামারা, দড়িপাড়া ও কর্নিবাড়িসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও করমজাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাঙনের কারণে নয়াপাড়া, চকরতিনাথ ও দক্ষিণ হাটবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম অন্যত্র অস্থায়ীভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

হাটশেরপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য বকুল মিয়া বলেন, গত কয়েক বছরে চকরতিনাথ, করমজাপাড়া, ধনেরপাড়া, কর্নিবাড়ি ও শিমুলবাড়ি গ্রামের প্রায় দেড় হাজার পরিবার নদীভাঙনের কারণে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। মানুষ চলে যাওয়ার ফলে স্কুলগুলোও শিক্ষার্থী হারাচ্ছে।

 সারিয়াকান্দির ইউএনও সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, উপজেলার চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে একটির ভবন নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় সেটি অন্যত্র স্থানান্তরের কাজ চলছে। উপজেলা শিক্ষা অফিস ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করছে। ভাঙন রোধে পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও জানানো হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন,  বগুড়া জেলার প্রায় ১১ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের কবলে রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু হচ্ছে। স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
 

আরও পড়ুন

×