ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

চালকলে অবাধে প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ

চালকলে অবাধে প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ
×

পাবনার ঈশ্বরদীর বিভিন্ন হাস্কিং চালকলে প্রকাশ্যেই বর্জ্য পুড়িয়ে সেদ্ধ করা হচ্ছে ধান। সম্প্রতি তোলা সমকাল

 সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা)

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাবনার ঈশ্বরদীতে খরচ কমাতে বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করছেন চাতাল মালিকরা। পলিথিন, পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিক-রাবারের পুরোনো জুতা স্যান্ডেল ও বিভিন্ন কারখানার ফেলে দেওয়া বর্জ্য পুড়িয়ে প্রকাশ্যেই ধান সেদ্ধ করা চলছে। এতে পরিবেশের পাশাপাশি ফল-ফসলের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

উপজেলার শতাধিক হাস্কিং মিল চাতালের বয়লারে প্রতিদিন এসব বর্জ্য পুড়িয়ে চাল উৎপাদন করা হচ্ছে। 
মিল মালিকদের ভাষ্য, ঈশ্বরদীতে রূপপুর প্রকল্প ও ইপিজেডের বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে বর্জ্য সুলভে পাওয়া যায়। এ কারণে তারা ধানের তুষ, গুঁড়া কিংবা অন্য কোনো জ্বালানির পরিবর্তে খরচ কমাতে বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করছেন। 

সরেজমিন দেখা গেছে, বর্জ্য পোড়ানোয় চাতাল এলাকা দুর্গন্ধময় ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকছে। এতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। মিল চাতাল থেকে উড়ে আসা কালো ধোঁয়া ও ছাই পড়ে ফল-ফসলেরও ক্ষতি হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ফসলের ফলন কমে গেছে বলে জানান ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। 

স্থানীয়রা জানান, কালো ধোঁয়ার সঙ্গে টায়ার, পলিথিন ও রাবার পোড়ানোর তীব্র দুর্গন্ধে বাড়িতে বসবাস করা দায় হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন যানবাহন ও পথচলতি মানুষ নানা সমস্যার মুখোমুখি হলেও চাতাল ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ করছেন না। প্রশাসন কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে অনেকটাই নির্বিকার বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা জানান, ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার রাস্তা ও আবাসিক এলাকায় বাড়িঘরের পাশে হাস্কিং চালকল ও ধান চাতালের বড় বড় চুলা ও বয়লারে ধানের তুষ-গুড়ার পরিবর্তে ক্ষতিকর বর্জ্য জ্বালিয়ে ধান সেদ্ধ করা হচ্ছে। এতে একদিকে কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে অন্যদিকে চাতালের চুলা ও বয়লারের চুলা থেকে ছাই উড়ে নষ্ট হচ্ছে আবাদি জমি। 
উপজেলার জয়নগর ও আইকে রোডে শতাধিক চালকলে দীর্ঘদিন ধরে রাবার ও বর্জ্য পুড়িয়ে প্রকাশ্যে ধান সেদ্ধ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয়রা বারবার নিষেধ করার পরও মিল-চাতাল মালিকরা কারও কথার তোয়াক্কা করছেন না।

আইকে রোডের সম্পদ ট্রেডার্সের পরিচালক মঞ্জুর রহমান বলেন, বর্জ্য পোড়ানো ছাই উড়ে আশপাশের গাছগাছালি ও বাড়িঘরের টিনের চালে এমনকি ঘরের আসবাব, বিছানা ও পোশাকে আস্তরণ পড়ে যায়। প্রতিনিয়ত এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে এলাকাবাসীদের। 
স্থানীয়রা মিল চাতালের মালিকদের এসব বিষয়ে বললেও তারা তাদের কথার কোনো গুরুত্ব দেন না। একই এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, শহরের ভেলুপাড়া থেকে শুরু করে আইকে রোড, সাকড়েগাড়ি ও জয়নগরের মোকামসহ রূপপুরের গ্রীনসিটি পর্যন্ত আমিরুল মন্ডল, মজিবর মোল্লা, কোয়েল মোল্লা, মাহাবুল চালকল, নুরুল হকের মিল, আলমের চাতাল, ছাত্তার রাইস মিলসহ শতাধিক হাস্কিং মিলে বর্জ্য পোড়ানো হয়। 

চাতাল মালিকদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, তুষে খরচ বেশি। আর বর্জ্য অপেক্ষাকৃত কম দামে পাওয়া যায়। এতে ধান সেদ্ধ করতে ব্যয় কম হয়।
ঈশ্বরদী উপজেলা চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি হাজী শামসুল আলম বলেন, সমিতির পক্ষ থেকে বারবার বলা সত্ত্বেও চাতাল মালিকরা বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করা বন্ধ করছেন না। বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ বলেন, কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে মাঠে ফসলের উৎপাদন কমছে। 
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় কমিটির সদস্য সহিদ মাহমুদ বলেন, বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করায় চালের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশের জন্য এসব বর্জ্য পোড়ানো কালো ধোঁয়া মানবদেহের জন্য যেমন মারাত্মক ক্ষতির কারণ, তেমনি ফসলের উৎপাদন ব্যাহত এবং গাছও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সবুজ পৃথিবী’ ঈশ্বরদী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বাবু বলেন, ক্ষতিকর বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করার কারণে ঈশ্বরদীর পরিবেশ চরমভাবে নষ্ট হচ্ছে। 
পাবনার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (দপ্তর প্রধান) মো. আব্দুল গফুর বলেন, এরই মধ্যে ঈশ্বরদী ইপিজেডসহ বিভিন্ন এলাকার কারখানা ও চাতালে অভিযান চালানো হয়েছে। ধানের মিল ও চাতাল মালিকরা যারা গোপনে পলিথিন, টায়ার, প্লাস্টিক-রাবারের জুতা পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করছেন, সেসব চাতালে আবারও অভিযান চালানো হবে। 
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, যেসব চাতালে বর্জ্য পুড়িয়ে ধান সেদ্ধ করে পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে, সেসব চাতাল সরেজমিন পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন

×