ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটে লোকসানে পোলট্রি শিল্প

মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটে লোকসানে পোলট্রি শিল্প
×

গাজীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় যে ডিম ছিল পুষ্টির প্রতীক, আজ সেটিই হয়ে উঠেছে হাজারো খামারির দীর্ঘশ্বাসের কারণ। প্রতিটি ডিমে লোকসান গুনতে গুনতে যখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছেন প্রান্তিক খামারিরা, তখন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে তারা বেছে নিলেন ডিম। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে শত শত ডিম ভেঙে তারা জানিয়ে দিলেন– শুধু ডিম নয়, ভেঙে যাচ্ছে তাদের বহু বছরের স্বপ্নও।
গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার জৈনাবাজার এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে শিমুলতলা পোলট্রি খামারি অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংগঠন। যেখানে অংশ নেন অন্তত ৫০ জন খামারি। কর্মসূচি শেষে মহাসড়কে শত শত ডিম ভেঙে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান তারা। পরে সড়কের ওপর ছড়িয়ে পড়ে ডিমের কুসুম-সাদা অংশ, আর খামারিদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে হতাশা ও ক্ষোভ।

খামারিদের অভিযোগ, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে গড়ে ৯ টাকা ৮০ পয়সা ব্যয় হলেও পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৭ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি ডিমেই প্রায় আড়াই টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। টানা ছয় মাস ধরে এমন পরিস্থিতিতে অনেক খামারি ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। কেউ ইতোমধ্যে খামার বন্ধ করেছেন, আবার অনেকেই সেই সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে।
তাদের দাবি, বাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে উৎপাদক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আবার ভোক্তারাও কম দামে ডিম পাচ্ছেন না। মাঝখানে লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া খামারিদের হাতে ছিল ব্যতিক্রমধর্মী নানা প্ল্যাকার্ড। সেখানে লেখা ছিল– ‘ডিম খেলে পুষ্টি মেলে, খামারিরা কেন ঋণের জালে?’, ‘ডিমের দাম কমলো কেন– জবাব চাই’, ‘যে দেশে একটি ভালো মানের সিগারেটের দাম ২৩ টাকা, সেই দেশে একটি ডিমের দাম সাড়ে ৭ টাকা হয় কীভাবে?’। এ সময় স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
আজিরন পোলট্রি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, মুরগির বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সেই হিসেবে ডিমের দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ঋণে জর্জরিত প্রান্তিক পর্যায়ের

খামারিরা ভয়াবহ অবস্থায় 
রয়েছে। প্রতিনিয়ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট খামার। ডিমের বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে 
শুধু খামারিরাই নন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণিসম্পদ খাতও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং উৎপাদককে ন্যায্যমূল্য দিতে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ সময়ের দাবি।

ডিমের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, মুরগির খাদ্য, বাচ্চা ও ওষুধের দাম কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণার দাবি জানান খামারিরা।
শ্রীপুর উপজেলা পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল মতিনের ভাষ্য, ৩-৪ হাত বদল হয়ে ভোক্তার কাছে ডিম যায়। প্রান্তিক খামারির কাছে থেকে এক ব্যবসায়ী কিনে নেন। তিনি আবার স্থানীয় আড়তদারের কাছে দেন। সেই আড়তদার আবার ঢাকায় আড়তে পাঠান। সেখান থেকে খুচরা বিক্রেতার হাত হয়ে ভোক্তার কাছে যায়। এই যে ৪ হাত বদল হলো, এরাই হলো মধ্যস্বত্বভোগী। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ডিম উৎপাদনকারী কোনো খামারি ডিমের দাম হাঁকাতে পারেন না। ঢাকার একটি সিন্ডিকেট প্রতিদিন দাম নির্ধারণ করে দেন। সেই দামেই বাধ্য হয়ে ডিম বিক্রি করতে হয়।
গাজীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে, জেলায় পোলট্রি খামারি আড়াই হাজারের মতো। শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন জানান, এর মধ্যে শ্রীপুর উপজেলায় রয়েছে সাড়ে ৩০০। শ্রীপুরে প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন

×