‘মিয়ানমারে নির্যাতন থেকে বাঁচতে এসেছিলাম, এখন মা-বাবা-ভাইকে হারালাম’
পাহাড় ধসে মাটিতে চাপা পড়া ঘর। ছবি: সমকাল
ইব্রাহিম খলিল মামুন, কক্সবাজার
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১৬:৫৫ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১৭:১০
রাত প্রায় দেড়টা। বাইরে টানা বৃষ্টি। বালুখালী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের ১৫ নম্বর ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে বাঁশ, ত্রিপল ও মাটির ঢালে তৈরি ঘরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘুমিয়ে ছিলেন আলী আহমেদ। হঠাৎ বিকট শব্দে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে তাদের ঘরের ওপর। মুহূর্তেই মাটিচাপা পড়ে পুরো ঘর। পরে উদ্ধারকারীরা এসে ধ্বংসস্তূপ থেকে বাবা কামাল হোসাইন (৫০), মা হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ভাই মোহাম্মদ আনাসের মরদেহ উদ্ধার করেন। এ সময় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আলী আহমদ।
নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আলী আহমেদ বলেন, ‘রোববার রাতে বৃষ্টি হওয়ায় আমরা প্রতিদিনের তুলনায় একটু আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ পাহাড় ধসে পুরো ঘর চাপা পড়ে যায়। প্রতিবেশী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আমাদের উদ্ধার করেন। কিন্তু আমার মা, বাবা ও ছোট ভাইকে আর বাঁচানো যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন মা-বাবা আর ছোট ভাইকে হারিয়ে কোথায় যাব, কী করব- কিছুই বুঝতে পারছি না।’
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ এবং দুজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
রোববার দিবাগত রাত ১টা থেকে ৩টার মধ্যে বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় মোট আটজনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত অন্যরা হলেন- ১১ নম্বর ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকের বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাকের দুই মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭) ও তানজিনা আক্তার (১৩), উম্মে হাবিবার দুই ছেলে মো. রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩) এবং কুতুপালং ৭ নম্বর ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকের বাসিন্দা মোহাম্মদ রশিদের ছেলে একরাম (৭)।
রোহিঙ্গা নেতা জাফর আলম বলেন, বর্ষা এলেই পাহাড়ধসের আতঙ্কে থাকেন শিবিরবাসী। পাহাড় কেটে তৈরি করা ঢালে নির্মিত বাঁশ ও ত্রিপলের ঘরগুলো ভারী বৃষ্টিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামান্য ধসও মুহূর্তেই বহু প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ আট রোহিঙ্গার মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ইতোমধ্যে অন্তত এক হাজার রোহিঙ্গাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও কয়েক হাজার মানুষকে পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া হবে। প্রাণহানি এড়াতে শিবিরগুলোতে সচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমিতে গড়ে ওঠা ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৮০ হাজার পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসে শিবিরগুলোতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।