ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সাত জেলায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, পানিবন্দি লাখো মানুষ

সাত জেলায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, পানিবন্দি লাখো মানুষ
×

ছবি: সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ২৩:০৭ | আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ২৩:০৯

কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কয়েক হাজার মানুষ উঠেছেন বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। বেশ কয়েকটি এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন। নেই মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক। তলিয়ে যাওয়া সড়কে যান চলাচল বন্ধ। কয়েক দিন ধরে পানির নিচে থাকা কয়েক হাজার হেক্টর জমির আমন ধান, সবজি ও বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এছাড়া সাত জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

বান্দরবানে দেড় হাজার মানুষ আশ্রয়শিবিরে
দুর্গতদের জন্য সাত উপজেলা ও দুই পৌরসভায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খিচুড়ি, শুকনা খাবার, মোমবাতি ও বিশুদ্ধ পানি দেওয়া হচ্ছে।

কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। নদীর দুই তীরের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বান্দরবান ও লামা পৌরসভার নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে পানিতে ঢুকেছে। তলিয়ে গেছে কয়েকশ হেক্টর সবজি ক্ষেত।

উপজেলাগুলোতে গত বুধবার রাত থেকে বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল ফোন সংযোগও নেই। এতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উপজেলার স্থানীয় ও পৌরসভার কিছু এলাকার বাসিন্দারা।

সড়কে পানি ওঠায় বান্দরবান থেকে রাঙামাটি এবং জেলা শহরের স্টেশন থেকে রুমা ও থানচির উদ্দেশে বৃহস্পতিবার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি।

বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া বয়স্ক পাহাড়ি নারী এসাইন মারমা বলেন, তাঁর বাড়ি মধ্যমপাড়ার সাঙ্গু নদীর পারে। পানিতে তাঁর ঘর ডুবে গেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁর মেয়ে ও দুই নাতনিকে নিয়ে এই স্কুলে এসেছেন। এখানে ঘুমানোর সমস্যা, ঠিকমতো রান্না করা যায় না, শৌচাগারের সমস্যা।

বান্দরবান শহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া মো. কামাল উদ্দিন বলেন, তিনি অনেকদিন ধরে অসুস্থ। এই আশ্রয়কেন্দ্রে এত মানুষের হট্টগোল ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে। এতে তাঁর শরীর আরও খারাপ লাগছে। জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে রাতে খিচুড়ি, মুড়ি, পানির বোতল, মোমবাতি দেওয়া হয়েছে। আর একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে পাউরুটি, চিড়ামুড়ি, মশার কয়েল, পানি ও ২০০ টাকা দিয়েছে।

জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস জানান, পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক সামাল দিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 

কক্সবাজারে পানিবন্দি লাখো মানুষ
কক্সবাজারের ১০ উপজেলায় বৃহস্পতিবারও বৃষ্টি অব্যাহত ছিল। রামু ও কক্সবাজার, ঈদগাঁও ও কক্সবাজার সদর উপজেলার ৬ ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

চকরিয়া উপজেলায় মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে চিরিংগা সেতু পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এছাড়া কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, চিরিংগা পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীর বিপৎসীমা ধরা হয় ৫ দশমিক ৮ মিটার। সকাল ৯টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ৬ দশমিক ২৯ মিটার।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, মাতামুহুরীর নদীর কোনাখালী পুরুইত্যাখালী পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢলের পানি লোকালয়ে ঢুকেছে। পৌরসভার ভাঙারমুখ, আমাইন্যারচর, নামার চিরিংগা ও মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালীর পুরুইত্যাখালী, মরংঘোনা এলাকায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ বাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানান, উপজেলার নতুন কিছু ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চকরিয়া উপজেলায় ২০ টন ও মাতামুহুরীতে ১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলম সমকালকে বলেন, দুর্গত মানুষের জন্য নগদ টাকা, চালসহ প্রয়োজনীয় অনুদান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান সমকালকে বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কক্সবাজার জেলা ৩০ লাখ নগদ টাকা, সাড়ে ৪০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্যাকেটজাত শুকনো খাবার জমা রয়েছে।

খাগড়াছড়ির পানি নামছে ধীরে ধীরে
বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে বৃষ্টিবিরতির ফলে পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। কিন্তু জেলা শহরের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা রয়েছে। জেলার দীঘিনালা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এলাকা পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে দীঘিনালাতেই।

খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়ক এবং দীঘিনালা-লঙগদু সড়কের দীঘিনালা অংশের বেশ কিছু জায়গা এখনও পানির নিচে রয়েছে। এসব সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

খাগড়াছড়ি জেলা সদরের নিম্নাঞ্চল পানির নিচে রয়েছে। চেঙ্গী নদীর পানি ধীরে ধীরে কমছে। তবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১৩৮ হেক্টর আউস ধান, গ্রীষ্মকালীন সবজি ১৪৩ হেক্টর, আমন ধানের বীজতলা ২০২ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

খাগড়াছড়ি সদরের গোলাবাড়ি ইউনিয়নের গঞ্জপাড়া এলাকার কৃষক মো. রহমত আলী বলেছেন, তাঁর ২০ শতক জায়গায় গ্রীষ্মকালীন ফসল তিন দিন ধরে পানির নিচে রয়েছে। এখন পানি নেমে গেলেও তাঁর ফসলের ক্ষতি হবে।

খাগড়াছড়ি সদরে চেঙ্গী নদীর তীরবর্তী গঞ্জপাড়া ছাড়াও কমলছড়ি, বেতছড়ি, রাজ্যমণিপাড়া, কালাডেবা, বটতলী, ফুটবিল, ঘাটপাড়া, আক্য ডাক্তারপাড়ার চরের ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। এসব ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন কৃষকরা।

দীঘিনালা উপজেলায় মাইনী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় গত দুই দিন ধরে বহু গ্রাম পানির নিচে রয়েছে। এ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কবাখালী ইউনিয়ন ও মেরুং ইউনিয়ন।

কবাখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নলেজ চাকমা বলেছেন, কবাখালী ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের হাজারের অধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে আরও দুটি কেন্দ্র খোলা হয়েছে। কবাখালী ইউনিয়নের ওপর দিয়ে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়ক চলে গেছে। কবাখালি এলাকায় সড়কটি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তাই সাজেক-খাগড়াছড়ি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

বোয়ালখালী ইউপি চেয়ারম্যান চয়ন জ্যোতি চাকমা জানান, তাঁর ইউনিয়নের বেশকিছু এলাকাতেও ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

মেরুং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিনা দেবী চাকমা জানিয়েছেন, তাঁর ইউনিয়নের বহু এলাকা এখনও পানির নিচে। স্টিলব্রিজ এলাকা, মেরুং বাজারসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সড়ক ডুবে যাওয়ায় দীঘিনালা-মেরুং-লংগদু সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। মেরুং ইউনিয়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫টি ও ইউনিয়ন পরিষদ জরুরি বিবেচনায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আরও ৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এদিকে মহালছড়ি উপজেলায় ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

দীঘিনালার ইউএনও তানজিল পারভেজ জানান, উজানের পানির স্রোত আর অব্যাহত বৃষ্টির কারণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় খাবার, পানি এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি জেলাশহর এবং দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ও কবাখালী এলাকায় প্রশাসন-জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি সেনাবাহিনী এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নিতে দেখা গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদে জরুরি ভিত্তিতে চারশ টন খাদ্য (চাল বা গম) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানান, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জীবনমান স্বাভাবিক রাখা এবং ভোগান্তি কমাতে যা যা করণীয় সরকারের তরফ থেকে নিশ্চিত করা হচ্ছে।

রাঙামাটিতে চার হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে
রাঙামাটি-চট্টগ্রাম, চন্দ্রঘোনা-বাঙালহালিয়া সড়কসহ অন্তত ১২৭টি স্থানে ছোট-বড় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার ৩০টি গ্রাম। এ পর্ষন্ত বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৪ হাজার ২৬৫ জন মানুষ। পানিতে ভেসে গিয়ে দুই ব্যক্তির মুত্যু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের সাপছড়ি এলাকায় পাহাড় ধসে প্রায় আড়াই ঘণ্টা যানবাহন চলা বন্ধ ছিল। পরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের লোকজন মাটি সরিয়ে ফেলে। এরপর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। চন্দ্রঘোনা-বাঙালহালিয়া সড়কের পাহাড় ধসে পড়ায় চলাচল বন্ধ ছিল। বিকেল চারদিকে মাটির সরানোর যানবাহর চলাচল স্বাভাবিক হয়। দীঘিনালা-মারিশ্যা সড়কের তিন কিলোমিটার পর্যন্ত ফাটল দেখা দেওয়ায় ওই রুটে যানবাহল বন্ধ রয়েছে। রাজস্থলী উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ির অরুণোদয় পয়েন্টের সীমান্ত সড়কে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়া রাঙামাটি শহরের এডিসি হিলে, পুরাতন লাইন, নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার-সংলগ্ন পাশের গলি, শিমুলতলী, কাউখালী উপজেলাসহ ১২৮টি ছোট বড় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে সম্পত্তি ও ঘরবাড়ি ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউই হতাহত হয়নি। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, ১০০টি আশ্রয়কেন্দ্রে  ৪ হাজার ২৬৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

পার্বত্য প্রতিমন্ত্রীর আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন
গত বুধবার রাতে শহরের লোকনাথ মন্দিরের আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। এ সময় সাংবাকিদের তিনি বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় তিন পার্বত্য জেলায় এক হাজার ৩০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা না পাওয়া পর্ষন্ত আশ্রয়গ্রহণকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

আটকে পড়া ৫৬১ জন পর্যটকের মধ্যে ১৫০ জন বৃহস্পতিবার দুপুরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেক ত্যাগ করেছেন। তাদের খাগড়াছড়িতে নেওয়া হয়েছে।

সাতকানিয়ায় পানিতে নিখোঁজ ১ 
চট্টগ্রামে সাতকানিয়ায় বৃহস্পতিবার ভোরে সাঙ্গু নদীতে লাকড়ি কুড়াতে গিয়ে আবদুল আলম (৩৬) নামে উপজেলার কালিয়াইশ ইউনিয়ন এলাকার এক ব্যক্তি নিখোঁজ হয়েছেন।

কালিয়াইশ ইউপি চেয়ারম্যান হাফেজ আহমেদ বলেন, আবদুল আলম একজন রিকশাচালক। তিনি এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে নৌকায় করে সাঙ্গু নদী থেকে লাকড়ি কুড়াতে গিয়ে পানিতে পড়ে যান। এখনও তাঁর খোঁজ মেলেনি। তিনি এ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মাইঙ্গাপাড়া এলাকা বাসিন্দা। 

চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণির কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। বিভিন্ন উপজেলার অনেক এলাকা বিদ্যুৎহীন রয়েছে। চট্টগ্রাম-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক সড়কের বড়দিঘিপাড় এলাকায় এখনও স্বাভাবিক হয়নি যান চলাচল। দুটি স্থানে কোমরপানির নিচে সড়ক। পানিতে ডুবে গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী এলাকা। ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৭১ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় এ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

চট্টগ্রাম সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, আঞ্চলিক মহাসড়ক পানিতে ডুবে থাকায় তিন দিন ধরে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রামের নিয়মিত বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। 

নওগাঁ শহর জলমগ্ন, রেকর্ড ২৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টি
টানা ২০ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে নওগাঁ শহর। শহরের প্রধান সড়ক, অলিগলি, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আত্রাই নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আবহাওয়া অফিস জানায়, গত বুধবার দুপুর ১২টা থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। এর আগে গত ২৩ এপ্রিল এক দিনে ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।

অন্যদিকে, টানা বৃষ্টিতে জেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ২৪ ঘণ্টায় আত্রাই নদীর পানি ১ দশমিক ৮৭ মিটার বেড়েছে। পানি বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জেলার নিম্নাঞ্চলে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মৌলভীবাজারে নদনদীর পানি বাড়ছে
মৌলভীবাজার জেলার সবক’টি নদনদীর পানি বেড়েই চলেছে। তবে মনু ও ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ২৮-৩০ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র স্রোতের ধাক্কায় মনু তীরের রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর স্থানে বৃহস্পতিবার বিকেলে ভেঙে গেছে বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ।

এদিকে দুদিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর সীমান্তবর্তী মখাবিল এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে এবং সড়কের কালভার্ট ভেঙে পড়েছে। আউশক্ষেত ও শাকসবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সুনামগঞ্জে ৫০ গ্রাম প্লাবিত
টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের নিচু এলাকার অনেক সড়ক ডুবে গেছে। কোথাও কোথাও বাড়ির আঙিনায় পানি উঠেছে। জেলা শহরের পাশ দিয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। ষোলঘর পয়েন্টে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ৭ দশমিক ২৪ মিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। মাত্র ৫৬ সেন্টিমিটার পানি বাড়লেই পানি বিপৎসীমায় পৌঁছাবে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা) বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের শক্তিয়ার খলার ১০০ ফুট ও আনোয়ারপুর সড়কের ৫০ ফুট সড়কে দুই ফুট পানি উঠেছে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙনে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে উপজেলার পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাহাড়ি ঢলের পানি উঠেছে। সীমান্ত নদী যাদুকাটা বৌলাই, মাহারাম, রক্তি পাটলাই দিয়ে ঢল নামছে। এসব নদীর পারের নিম্নাঞ্চলের ৫০টিরও বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

সিলেটে টিলাধস
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষণাবন্দ পূর্বভাগ এলাকায় গত বুধবার টিলা ধসে পড়েছে। তবে এতে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ইউএনও মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। 

হবিগঞ্জে নদনদীর পানি বৃদ্ধি 
হবিগঞ্জের নদনদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ছে। জেলার খোয়াই নদীর চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্টে ৯৯ সেন্টিমিটার এবং মাছুলিয়া পয়েন্টে ১১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় হবিগঞ্জে ৬১ দশমিক ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। 

কিশোরগঞ্জের তিন উপজেলায় দুর্ভোগ
কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামে জনদুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। পাউবোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কালনী নদীর পানির লেভেল ২.৪৭ মিটার রেকর্ড করা হযে়ছে, যা প্রাক-বর্ষা বিপৎসীমার (৫.৩৫ মিটার) ২৮৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া ইটনা স্টেশনে ধনু-বৌলাই নদীর পানি ৩.১৪ মিটার এবং চামড়াঘাট স্টেশনে ধনু নদীর পানি ২.৭৫ মিটারে অবস্থান করছে। 

সুন্দরগঞ্জে ডুবে গেছে রাস্তা ও নিচু এলাকা
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ডুবে গেছে রাস্তাঘাট, পুকুর-ডোবা, নদী-নালা, খালবিল, খেলার মাঠ ও নিচু এলাকার বসতবাড়ি। উজানের ঢলে তিস্তার চরের হাজারও পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হচ্ছে। হাঁটুপানি জমে গেছে শহরের বিভিন্ন সড়কে।
 
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার ব্যুরো, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা]

আরও পড়ুন

×