‘মাইয়া গুলা নিয়া আমি যামু কই, কার দোয়ারে আশ্রয় নিমু’
বিপর্যস্ত কক্সবাজারে অবশেষে স্বস্তির আভাস, ভেসে আসছে ক্ষতচিহ্ন
পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাইছড়ি ভেলুয়া পাড়ায় বন্যায় ধসে পড়া বাড়ির সামনে আহাজারি করছেন শাহাজান বেগম। ছবি সোমবার বিকেলে তোলা
ইব্রাহিম খলিল মামুন, কক্সবাজার ও হিরু আলম, পেকুয়া
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ২১:০৮
ভেঙে পড়া বাড়ির কোনোরকম টিকে থাকা বাঁশের একটি খুঁটি ধরে বিলাপ করছেন পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাইছড়ি ভেলুয়া পাড়ার শাহাজান বেগম। ঘরটির কোথাও কোনো অংশ অবশিষ্ট নেই, বেড়ার ঘেরাগুলো পানির স্রোতে ভেসে গেছে। উপরে জং ধরা জরাজীর্ণ টিনের চালটি কোনরকম টিকে আছে। বর্তমান অবস্থার কথা জানতে চাইলেই হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে শাহাজান বেগম বলেন, উপযুক্ত মাইয়া গুলা নিয়া আমি যামু কই? কার দোয়ারে আশ্রয় নিমু?
সোমবার রাতে পানি বাড়তে থাকলে স্বামী স্ত্রী মিলে চারদিকে রশি দিয়ে গাছের সাথে ঘরের চাল গুলো বেধে দেন তারা। দুই মেয়ে সন্তানকে ভাত দিয়ে পাহাড়ায় জেগে থাকেন দুজনে। ঘরে কোনো খাট নেই মেয়েরা ঘুমায় মেঝেতে। মধ্যরাতে পানি বাড়তে থাকে সকাল পর্যন্ত ঘরের ভেতর কোমর সমান পানি হয়ে যায়৷ বেড়ার ঘেরাগুলো হেলে পড়লে সবাই মিলে ঠেস দেয়। কিন্তু বুধবার রাতে তা পুরো বাড়ি সহ ধসে পড়ে। এরপর থেকেই পানির মাঝে কালো পলিথিনের নিচে সবাই মিলে বসবাস করে আসছেন। পানি নেমে গেলেও নতুন ঘর বানানোর সাধ্য তাদের নেই। স্বামী কামাল হোছাইন একজন ডায়াবেটিস রোগী, একটি দাতও অবশিষ্ট নেই। ভালো করে কিছু খেতে পারেন না। এ দূরাবস্থার মধ্যে এখন পর্যন্ত সরকারি বেসরকারি কেউই তাদেরকে দেখতে পর্যন্ত আসেনি, সহযোগীতো দূরের কথা।
টানা গত এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত কক্সবাজারে অবশেষে স্বস্তির আভাস মিলতে শুরু করেছে। রোববার সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় জেলার প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে ধীরে ধীরে বন্যার পানি নামছে। ঘরবাড়ি, আঙিনা ও নিচু এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতা রয়েছে। সুপেয় পানি, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীর সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন শাহাজান বেগমের মতো হাজারো দুর্গত মানুষ। পাশাপাশি ভেসে আসছে প্লাবিত এলাকার ক্ষতচিহ্নগুলো।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, কক্সবাজার জেলার ১০ উপজেলায় ৭০টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬৬৩টি বসতবাড়ি। এছাড়াও ১৬২৪ কিলোমিটার কাচা সড়ক, ২০১ কিলোমিটার পাকা ও ২২০ কিলোমিটার ইটের সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১৫টি সড়ক-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪৩ হাজার ২১০ হেক্টর ফসলী জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সোমবার পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিতরণ করা হয়েছে- ২৯৮ মেট্রিকটন চাল, ৭৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার।
তবে জেলার সার্বিক চাহিদা বিবেচনায় প্রয়োজন রয়েছে- প্রায় ৫৭ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ২৪৯ লাখ টাকা, ৫৩০ মেট্রিক টন চাল, চার হাজার ৮৮৩ বান্ডিল ঢেউটিন এবং ৯৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট। এরমধ্যে বর্তমানে সরকারি মজুদে রয়েছে তিন হাজার ৬৩৫ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২৩৩ মেট্রিক টন চাল।
সোমবার সকাল থেকে কক্সবাজারে বৃষ্টির দেখা মেলেনি। এর আগের দিন রোববারও সারাদিনে কেবল দুপুরের দিকে সামান্য সময়ের জন্য বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল, গ্রামীণ সড়ক এবং বসতবাড়িতে জমে থাকা পানি ধীরে ধীরে নেমে যেতে শুরু করেছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, রোববার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। এরপর থেকে সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত কার্যত কোনো বৃষ্টি হয়নি। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় বিকেল ৩টা পর্যন্ত মাত্র ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।
তিনি বলেন, আপাতত একটানা ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। আগামী বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবার কিছু বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে সেটি টানা হবে না।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী এলাকার মানুষ। এসব এলাকায় সুপেয় পানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ চললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে দাবি স্থানীয়দের।
চকরিয়া উপজেলার কাকারার লক্ষ্যারচর এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, আমরা জান বাঁচাতে বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম অন্য জায়গায়। কারণ বাড়িতে গলা সমান পানি উঠেছিল। তিনদিন পর এসে দেখি আসবাবপত্র, গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস সব শেষ। ধান-চালও ভিজে গেছে। এখন কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না।
বন্যা দুর্গত এলাকার আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, চারদিন পর সোমবার এসেছি বাড়ির অবস্থা দেখতে। আমরা পানিবন্দি বাড়ির সব কিছু শেষ হয়ে গেছে আসবাবপত্র থেকে শুরু করে আমাদের সহায় সম্পত্তি ধান চাল, বাচ্চাদের বইপত্র। বলা যায় সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। জান বাঁচাতে তাড়াতাড়ি ৮ সদস্যদের পরিবার নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্র ছুটে গিয়েছিলাম। আমাদের জন্য সরকার বা বেসরকারি কেউ সহায়তা নিয়ে এখনও এগিয়ে আসেনি।
তবে এ অভিযোগ নাকচ করে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলম বলেন, প্রতিটি উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পর্যাপ্ত চাল, শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
- বিষয় :
- কক্সবাজার
- বন্যা
- ত্রাণ বিতরণ