ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

বৃষ্টি রম্য

ঢাকার বর্ষা, নাগরিক আচরণ এবং উন্নয়নের জলজ সংস্কৃতি

ঢাকার বর্ষা, নাগরিক আচরণ এবং উন্নয়নের জলজ সংস্কৃতি
×

মো. আব্বাস

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ২১:২১

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানেন?
না, জলাবদ্ধতা নয়।
সমস্যা হলো, আমরা খুব অকৃতজ্ঞ জাতি।
বিশেষ করে ঢাকার মানুষ।
বৃষ্টি হলেই শুরু হয় অভিযোগ। রাস্তা ডুবে গেছে, গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে, অফিস যেতে পারছি না, নর্দমার পানি রাস্তায় উঠে এসেছে। যেন এগুলো খুব খারাপ কিছু!
আমি বরং বলব, পৃথিবীর আর কোনো শহর নাগরিকদের এত কাছ থেকে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে না।
ইউরোপের মানুষ বৃষ্টি দেখে ছাতা খোলে।
ঢাকার মানুষ বৃষ্টি দেখে প্যান্ট গুটিয়ে নেয়।
এটাই সংস্কৃতি।
অনেকে আবার বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘রাস্তায় হাঁটুপানি’।
হাঁটুপানি তো ভালো খবর।
কোমরপানি হলে অন্তত শরীরচর্চাও হয়ে যায়।
জিমে মাসে হাজার হাজার টাকা খরচ করার চেয়ে অফিসে যাওয়ার পথে একটু সাঁতার কেটে নেওয়া কি বেশি স্বাস্থ্যকর নয়?
বিদেশে মানুষ আলাদা করে সুইমিং পুলে যায়।
আমাদের শহর পুরো রাজধানীকেই সুইমিং পুল বানিয়ে দিয়েছে।
এত বড় নাগরিক সুবিধা পৃথিবীর আর কোথাও নেই।
কিন্তু আমরা কি একবারও ধন্যবাদ দিই?
দিই না।
বরং অভিযোগ করি।
আরেকটি বিষয় নিয়ে আমি খুবই অবাক।
মানুষ বলে, নর্দমার পানি আর বৃষ্টির পানি নাকি এক হয়ে যায়।
এতে সমস্যা কোথায়?
আমরা তো ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই।
পানি যদি এই শিক্ষা বাস্তবে প্রয়োগ করে, তাতে আপত্তি কেন?
আর মানুষের বর্জ্য নিয়ে এত লজ্জা কীসের?
সারা বছর নিজেরাই উৎপাদন করব, তারপর বৃষ্টি হলে সেটি যদি ভালোবেসে আবার আমাদের পায়ের কাছে ফিরে আসে, তাহলে এত বিরক্ত হওয়ার কী আছে?
শেষ পর্যন্ত আপন জিনিস আপনজনের কাছেই ফিরে আসে।
এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম।
অনেককে দেখি পানি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন।
কেউ ইটের ওপর লাফাচ্ছেন।
কেউ রিকশার সিটে দুই পা তুলে বসে আছেন।
কেউ আবার এমনভাবে হাঁটছেন, যেন পানির নিচে কুমির আছে।
আরে ভাই, একটু সাহসী হন।
এই পানির মধ্যেই তো আপনার গত সপ্তাহের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক আছে।
গত মাসের চিপসের প্যাকেট আছে।
গত বছরের পলিথিন আছে।
আর হয়তো আপনারই কোনো একদিনের সভ্যতার চূড়ান্ত অবদানও আছে।
নিজের জিনিসকে এত ভয় পাওয়ার কী আছে?
বর্ষার আরেকটি বড় সৌন্দর্য হলো রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি।
আমাদের উন্নয়নের আসল সৌন্দর্য এখানেই।
অনেকেই ভুল করে ভাবেন, রাস্তা একবার বানালেই নাকি শেষ।
কী ভয়ংকর চিন্তা!
তাহলে এত দপ্তর কাজ করবে কীভাবে?
এক দপ্তর রাস্তা বানাবে।
আরেক দপ্তর সেটি কাটবে।
তৃতীয় দপ্তর পাইপ বসাবে।
চতুর্থ দপ্তর আবার কাটবে।
পঞ্চম দপ্তর বলবে, আগের কাজটি ঠিক হয়নি।
তারপর আবার নতুন করে খোঁড়া হবে।
একে বলে কর্মসংস্থান।
একটি রাস্তা যদি পাঁচ বছরে মাত্র একবার খোঁড়া হয়, তাহলে এত কর্মকর্তা, ঠিকাদার, শ্রমিক, প্রকৌশলী, ব্যারিকেড, সাইনবোর্ড, বাঁশ এবং লাল ফিতা নিয়ে আমরা কী করব?
বর্ষাকালে সেই গর্তগুলো পানিতে ভরে যায়।
এতে নাগরিকদের জন্য বাড়তি আনন্দের ব্যবস্থা হয়।
কোনটি রাস্তা, কোনটি ডোবা, আর কোনটি ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সম্ভাবনা, তা প্রতিদিন নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়।
একে বলে নাগরিক অভিযাত্রা।
সবকিছু যদি আগে থেকেই জানা থাকে, তাহলে জীবনে রোমাঞ্চ কোথায়?
আবার অনেকেই বলেন, গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়।
এত অভিযোগ!
গাড়ি কি সারাক্ষণ শুকনো রাস্তায় চলার জন্য?
একটু জলজ পরিবেশে অভ্যস্ত হতে দিন।
মাছ পারে।
নৌকা পারে।
গাড়িও একদিন পারবে।
বিশ্বাস রাখতে হবে।
বৃষ্টি হলেই আবার সামাজিক মাধ্যমে ছবি।
কেউ পানিতে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছেন।
কেউ মোটরসাইকেল ঠেলছেন।
কেউ বাস থেকে নেমে হাঁটুপানি মাড়িয়ে যাচ্ছেন।
তারপর লিখছেন, ‘এ কেমন শহর?’
অথচ একটু কৃতজ্ঞ হলেই লিখতে পারতেন, ‘আজও রাজধানী আমাকে বিনামূল্যে জলক্রীড়ার সুযোগ দিল।’
সবচেয়ে অবাক লাগে, প্রতি বছর মানুষ একই প্রশ্ন করে।
‘প্রতি বর্ষায় একই অবস্থা কেন?’
আরে ভাই, ঋতুচক্র বলে একটা বিষয় আছে।
গ্রীষ্মে গরম পড়বে।
শীতে ঠান্ডা পড়বে।
আর বর্ষায় ঢাকা ডুববে।
এটাই তো ধারাবাহিকতা।
প্রকৃতি যদি প্রতি বছর একই নিয়ম মেনে চলে, তাহলে শহর কেন তার ঐতিহ্য বদলাবে?
সবশেষে নাগরিকদের প্রতি আমার ছোট্ট অনুরোধ।
বর্ষাকালে দয়া করে আর অভিযোগ করবেন না।
এক জোড়া স্যান্ডেল রাখুন।
প্যান্ট গুটিয়ে বের হন।
প্রয়োজনে লাইফ জ্যাকেট কিনুন।
আর যদি কোনো দিন দেখেন, বৃষ্টির পানির সঙ্গে ভেসে আসা সভ্যতার কোনো পুরোনো স্মৃতি আপনার পায়ের আঙুলে আলতো করে ধাক্কা দিল, তাহলে ভয় পাবেন না।
ভাববেন, এ শহর তার নাগরিকদের কখনো ভুলে যায় না।
আপনি যা শহরকে দিয়েছেন, একদিন না একদিন শহরও ঠিক সেটাই সুদে-আসলে আপনার কাছে ফিরিয়ে দেয়।
 

মো. আব্বাস: যোগাযোগ পেশায় কর্মরত
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×