ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

সড়ক দুর্ঘটনা

ডিমের দামে নয়, প্রাণের দামে কেনা শিক্ষা

ডিমের দামে নয়, প্রাণের দামে কেনা শিক্ষা
×

ডিম কুড়াতে গিয়ে বাসের চাপায় নিহত ৫, বিক্ষুব্ধ জনতার আগুনে পুড়ল ছয়টি গাড়ি। ছবি: সমকাল

হুমায়ুন আহমেদ বিলাস

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ২১:০১

একটি ডিমের দাম কত? ১০ টাকা, ১৫ টাকা, কিংবা সর্বোচ্চ ২০ টাকা। কিন্তু সেই ডিম কুড়াতে গিয়ে যদি পাঁচটি প্রাণ ঝরে যায়, তাহলে প্রশ্নটি আর অর্থনীতির থাকে না। বরং এটি হয়ে ওঠে মানবিকতা, সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার সোয়াদী বাসস্ট্যান্ডে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমাদের শুধু কাঁদায় না, একই সঙ্গে অস্বস্তিতেও ফেলে। ঘটনার শুরু একটি দুর্ঘটনা দিয়ে। ঢাকা থেকে খুলনার দিকে যাওয়ার পথে একটি ডিমবাহী ট্রাকের চাকা ফেটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কে উল্টে যায়। শত শত ডিম ছড়িয়ে পড়ে সড়কে। ডিম কুড়াতে ছুটে আসেন স্থানীয় মানুষ। ঠিক সেই মুহূর্তে দ্রুতগতির একটি যাত্রীবাহী বাস তাদের ওপর দিয়ে চলে যায়। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ঝরে যায় পাঁচটি প্রাণ। আহত হন আরও অনেকে।

এই ঘটনাকে কি শুধু দুর্ঘটনা বলা যায়? নাকি এটি আমাদের সামাজিক বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি?

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, কয়েকটি ডিমের জন্য জীবন ঝুঁকিতে ফেলা নিছক বোকামি। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, এই ঘটনার পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় বাস্তবতা। এমন একটি সমাজে আমরা বাস করি, যেখানে অনেক মানুষের কাছে কয়েকটি ডিমও একটি পরিবারের এক বেলার পুষ্টির নিশ্চয়তা। দারিদ্র্য মানুষকে কখনও কখনও এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যা বাইরে থেকে অযৌক্তিক মনে হলেও তার কাছে সেটিই বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন একটি নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই কোথাও না কোথাও বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল কিংবা অন্য কোনো যানবাহনের সংঘর্ষে প্রাণহানির খবর চোখে পড়ে। কিন্তু কয়েকদিন পরই সেই ঘটনা হারিয়ে যায় নতুন কোনো দুর্ঘটনার খবরে। আমরা শোক করি, ক্ষোভ প্রকাশ করি, তদন্ত কমিটি গঠন করি, তারপর আবার সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সাত হাজার ৩৫৯ জন এবং আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। নিহতদের মধ্যে ৯৬২ জন নারী এবং এক হাজার আটজন শিশু। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলকে কেন্দ্র করে। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং অসংখ্য অপূর্ণ গল্প।

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকদের দায়ী করলে ভুল হবে। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, ওভারলোড, চালকদের অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে শিথিলতা, পথচারীর অসচেতনতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা সব মিলিয়েই তৈরি হয় দুর্ঘটনার পরিবেশ।

চালকদের কর্মপরিবেশও এই আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। অনেক পরিবহনে চালকদের নির্দিষ্ট বেতন নেই। ট্রিপ যত বেশি, আয় তত বেশি। ফলে সময়ের সঙ্গে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। বিশ্রামহীন চালনা, অতিরিক্ত গতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং যেন স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ক্লান্ত একজন চালকের হাতে শতাধিক যাত্রীর জীবন তুলে দেওয়ার অর্থই হলো একটি সম্ভাব্য দুর্ঘটনার দিকে এগিয়ে যাওয়া।
একই সঙ্গে পথচারীদের আচরণও বদলাতে হবে। ফুটওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও রাস্তা পার হওয়ার শর্টকাট খোঁজা, চলন্ত বাসে ওঠা-নামা, ব্যস্ত মহাসড়কে দাঁড়িয়ে পণ্য সংগ্রহ করা কিংবা ট্রাফিক আইনকে গুরুত্ব না দেওয়া, এসব অভ্যাস আমাদের প্রতিদিন আরও ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।

ফরিদপুরের ঘটনাটির দিকেই তাকানো যাক। একটি ট্রাক উল্টে যাওয়ার পর এত মানুষ কীভাবে নির্বিঘ্নে মহাসড়কে নেমে গেল? দুর্ঘটনার পরপরই কি মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছিল? দ্রুতগতির যান চলাচল বন্ধ করা হয়েছিল? ঘটনাস্থলে জরুরি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছিল? যদি এসব ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর হতো, তাহলে হয়তো দ্বিতীয় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটত না।

বিশ্বের অনেক দেশ সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পেরেছে। তারা শুধু আইন কঠোর করেনি, মানুষের আচরণও পরিবর্তন করেছে। স্কুল পর্যায় থেকেই ট্রাফিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চালকদের প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা কঠোর করা হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে কয়েক মিনিটের মধ্যে জরুরি সেবা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সড়ক নিরাপত্তাকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
বাংলাদেশেও পরিবর্তন সম্ভব। তবে এর জন্য খণ্ডিত উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা।
আমাদের কী করা উচিত?

প্রথমত, সড়ক নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য প্রতিটি মহাসড়কে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল র‌্যাপিড রেসপন্স ইউনিট গড়ে তুলতে হবে।
চতুর্থত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা, স্পিড মনিটরিং, স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল নজরদারি বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, স্কুল পর্যায় থেকেই বাধ্যতামূলক সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা চালু করতে হবে। ট্রাফিক আইন শুধু মুখস্থ নয়, চর্চার বিষয় হতে হবে।
ষষ্ঠত, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতামূলক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কারণ নিরাপদ সড়ক কেবল আইন দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সংস্কৃতির পরিবর্তন।
আমরা প্রায়ই বলি, ‘দুর্ঘটনা নয়, অব্যবস্থাপনাই মানুষ হত্যা করে।’ কথাটি নিছক স্লোগান নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। তবে অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নাগরিক দায়িত্ববোধের অভাবও কম দায়ী নয়। রাষ্ট্রের যেমন নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব নিজের জীবনকে অমূল্য হিসেবে বিবেচনা করা।

ফরিদপুরের সেই পাঁচজন মানুষ হয়তো কখনও ভাবেননি, কয়েকটি ডিম কুড়াতে গিয়ে সেটিই হবে তাদের জীবনের শেষ দিন। তাদের মৃত্যু আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়ে গেছে। সড়কে এক মুহূর্তের অসতর্কতা কখনও কখনও পুরো একটি পরিবারকে চিরদিনের জন্য নিঃস্ব করে দেয়।

তবে এই বাস্তবতা কোনোভাবেই মানবজীবনের মূল্যকে খাটো করতে পারে না। কোনো খাদ্য, কোনো সম্পদ, কোনো বস্তুই মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান নয়। ব্যস্ততম একটি মহাসড়কে নেমে ডিম কুড়ানো যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, সেই সহজ সত্যটি যদি আমরা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ, সব স্তরে প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, তাহলে উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা আধুনিক অবকাঠামোর সব অর্জনই শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

হুমায়ুন আহমেদ বিলাস: যোগাযোগ পেশায় কর্মরত
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×