ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

বন্যা পরিস্থিতি

তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চাহি

তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চাহি
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১০:১২

টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি এখন আতঙ্কেরও অধিক। দেশের নদনদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ১৬ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি বা অবনতির আশঙ্কা করা হইতেছে। ইতোমধ্যে দেশের পাঁচটি নদীর পাঁচটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার উপর দিয়া প্রবহমান।

এরই মধ্যে ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। প্রাণ হারাইয়াছেন প্রায় অর্ধশত মানুষ। ৬ ও ৭ বছরের দুইটি শিশুর পানির তীব্র স্রোতে ভাসিয়া যাইবার মর্মান্তিক খবরও আমরা জানিলাম। সারাদেশে বন্যায় পানিবন্দি দুই লক্ষাধিক মানুষ; ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লক্ষাধিক। এই কথা সত্য, বহু দুর্যোগ বাংলাদেশ মোকাবিলা করিয়াছে। কিন্তু সর্বান্তঃকরণে পানিতে ডুবিয়া থাকা বানভাসি মানুষের অসহায় মুখ দেখিয়া আবারও মনে প্রশ্ন জাগিতেছে, পূর্বপ্রস্তুতি জোরালো হইলে কি দুর্যোগের প্রভাব ন্যূনতম করা যাইত না? যেইখানে ব-দ্বীপের পলিমাটির এই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল প্রতিবছর বন্যায় প্লাবিত হইতেছে।

এইদিকে রবিবারের রাজধানীর দৃশ্যও কম আতঙ্কের নহে। নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনা যেন পানির তলায় ডুবিয়াছে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে সড়কে ১০ মিনিটের পথ তিন ঘণ্টায়ও অতিক্রম করিতে পারেন নাই অনেকে। রাত ১২টা হইতে রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হইয়াছে। চলতি মাসে এই পরিমাণ বৃষ্টি আগে হয় নাই। স্কুল শিক্ষার্থী হইতে হাসপাতালমুখী গুরুতর রোগী সকলকেই দুর্ভোগে পড়িতে হইয়াছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানাইতেছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় দেশব্যাপী আগামী পাঁচ দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকিতে পারে। এইরূপ হইলে পরিস্থিতির আরও দ্রুত অবনতি হইবে। খাদ্য সংকটও দেখা দিতে পারে; যাহা ইতোমধ্যে বন্যাদুর্গত মানুষকে ভোগাইতেছে। 

বলিবার অপেক্ষা নাই, বন্যার সবচেয়ে বড় ক্ষতি সাধারণ মানুষের। কৃষকের ক্ষেতের ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসল পানিতে ডুবিয়াছে। দিনমজুরের কাজ বন্ধ হইয়াছে; জেলে নদীতে নামিতে পারেন নাই; ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান বন্ধ রাখিতে হইতেছে। অন্তঃসত্ত্বা, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষ চিকিৎসাসেবা হইতে বঞ্চিত হইতেছেন। বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত ব্যাধি ছড়াইয়া পড়িবার আশঙ্কা বাড়িতে থাকে বন্যার পানিতে টান শুরু হইলে। তবে এই মুহূর্তে সেই সকল চিন্তা হইতেও বড় দুশ্চিন্তা বন্যাকবলিত স্থানে মানুষের প্রাণ রক্ষা। এইবার অধিক ক্ষতি হইয়াছে চট্টগ্রামে। চকরিয়া, বাঁশখালীসহ সম্পূর্ণ চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যা ও পাহাড়ধসে ৩৯ জন প্রাণ হারাইয়াছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানাইয়াছে, দুর্গত মানুষের জন্য এক হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হইয়াছে বিভিন্ন স্থানে। যেইখানে বর্তমানে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন ৪৪ সহস্রাধিক মানুষ। 

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অনেক জীবন রক্ষা পাইয়াছে, সত্য। কিন্তু প্রতিবছর একই সংকট দেখা দিলে কেবল ত্রাণ বিতরণকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসাবে দেখিবার সুযোগ সামান্য।

বর্তমানে এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে যাহাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণই উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হয়। নদী খনন, বাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, খাল পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা ব্যতিরেকে এই সংকট হইতে উত্তরণ সম্ভব নহে। বন্যা শুরু হইলে শুধু ত্রাণ বিতরণ করিয়া স্বীয় দায়িত্ব সম্পন্ন হইয়াছে ভাবিবার আত্মতুষ্টি দূর করিতে হইবে সকলকে।

আরও পড়ুন

×