অন্যদৃষ্টি
নিরাপদ বার্ধক্যের প্রস্তুতি
মাহজাবিন আলমগীর
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১০:০৬
দেশে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি প্রবীণ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির সুবাদে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং মৃত্যুর হার কমে আসায় বার্ধক্যে উপনীত লোকের হার দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে দ্রুত নগরায়ণের প্রভাবে যৌথ পরিবার কাঠামোর ভাঙন আর বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বার্ধক্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে প্রবীণরা সাধারণত বার্ধক্যকে নিয়তির ওপর ছেড়ে দেন। ভাবেন, যথেষ্ট অর্থবিত্তের অধিকারী আর দায়িত্বশীল সন্তান থাকলেই বার্ধক্য নিশ্চিন্তে কেটে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সুস্থ ও নিরাপদ বার্ধক্যের জন্য দরকার পূর্ণ শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি। কেননা, বার্ধক্য একক যাত্রা; পরিবার ও সন্তান তাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বার্ধক্যের নির্মম বাস্তবতা হলো, ব্যক্তিকে নিজেরই মোকাবিলা করতে জানতে হয়।
বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি শারীরিক নানা জটিলতার পাশাপাশি একাকিত্ব ও বিষণ্নতায় সহজেই আক্রান্ত হন। এ ছাড়া কাছের মানুষকে হারানোর শোক, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আত্মসম্মানবোধের অভাব প্রবীণ ব্যক্তিকে আরও মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। তাই বয়সজনিত নানা পরিবর্তন কী করে মোকাবিলা করতে হবে; একাকিত্বের সঙ্গে কী করে মানিয়ে চলতে হবে, সে জন্য চাই সঠিক নির্দেশনা বা কাউন্সেলিং। অথচ আমাদের দেশে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয় বরাবরই উপেক্ষিত। যেমন মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একটা কথা আছে– ‘কমপ্লিকেটেড গ্রিফ রিঅ্যাকশন’। অর্থাৎ প্রিয়জন হারানোর শোক বা বেদনা দীর্ঘকাল চলতে থাকলে সেই ব্যক্তি হতাশা বা দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। অথচ মানসিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
কোনো কাজের মধ্যে থাকলে সাধারণত এসব অবস্থা দ্রুতই কেটে যায়। তাই অবসর মানেই জীবন থেকে অবসর নয়। প্রবীণদের উপযোগী কাজের ক্ষেত্র সমাজকেই তৈরি করে দিতে হবে। স্বল্প পরিশ্রম আর বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে তাদের নিয়োগ বাড়াতে হবে। যেমন কোনো সংগঠনের পরামর্শদাতা। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে প্রবীণদের কাজের সুযোগ কম। আবার প্রবীণদের জন্য সরকারি যে ভাতা চালু আছে; যুগের তুলনায় নিতান্তই সামান্য। প্রবীণদের স্বার্থ সুরক্ষায় নেই উল্লেখযোগ্য সংগঠন। প্রবীণ সংঘ নামে যে সংগঠন আছে, তাও নানা অনিয়ম আর দুর্নীতিতে জর্জরিত।
আমাদের সমাজে শিক্ষিতের হার বাড়লেও প্রবীণদের নিয়ে বদ্ধমূল ধারণার পরিবর্তন হয়নি। অনেকেই ভাবেন– প্রবীণ হয়ে গেছেন; সমাজে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। কিন্তু স্বল্প পরিশ্রমের কাজ প্রবীণ বয়সে করা যায় নিঃসংকোচে। তাতে বরং সতেজ আর ফুরফুরে থাকা যায়। এশিয়ার দেশ জাপানে যেখানে মানুষের গড় আয়ু অনেক বেশি, সেখানকার চিত্র ভিন্ন রকম। ৯০ বছরের বৃদ্ধও বাজার থেকে শুরু করে রান্না, সবই করেন। অথচ আমাদের দেশে প্রবীণরা ভাবেন, কারও সাহায্য ছাড়া বোধ হয় সুস্থ জীবনধারণ সম্ভব নয়।
আজকের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বায়ন আর প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষে পারিবারিক বন্ধন যখন শিথিল হতে শুরু করেছে; চরম আত্মকেন্দ্রিকতা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতা নষ্ট করে দিচ্ছে। সমাজে ভোগবাদিতা যতই বাড়ছে, প্রবীণদের প্রতি অবহেলা তীব্রতর হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার আগেই নিতে হবে প্রস্তুতি। প্রথমে নিজের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করা দরকার। ভালো থাকার চাবিকাঠি নিজেকেই তৈরি করতে হবে।
বার্ধক্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে তাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করতে জানতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রবীণ ব্যক্তির জন্য পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো; শিশুদের মতো প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। যেখানে প্যালিয়াটিভ কেয়ার আর জেরিয়াট্রিক মেডিসিন চালু করা আবশ্যক। প্রবীণ ব্যক্তির নিজের অধিকার সচেতনতা বাড়াতে হবে। দরকার পারিবারিক সম্পর্কগুলোরও একটু যত্ন নেওয়া, যাতে বার্ধক্যকে আনন্দমুখর করে তোলা যায়। মনে রাখতে হবে, আমাদের আজকের প্রস্তুতি দিতে পারে আগামী দিনের নিরাপদ বার্ধক্যের প্রতিশ্রুতি।
মাহজাবিন আলমগীর: শিক্ষক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি