ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ফিফা কি রাজনীতির হাতিয়ার?

ফিফা কি রাজনীতির হাতিয়ার?
×

জাবিয়ার আবু ঈদ

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১০:০৮

চলমান বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ যত দিন গড়াচ্ছে,  ফিফা তথা আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন এবং এর নেতৃত্বকে ততই কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর এক মার্কিন ফুটবল খেলোয়াড়ের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে মিসর ও কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচে রেফারিদের সিদ্ধান্ত পক্ষপাতদুষ্ট ছিল; যেটি আর্জেন্টিনার পক্ষে ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ফিলিস্তিনে আমরা বহু বছর ধরেই ফিফার দুর্নীতিগ্রস্ত চরিত্র প্রত্যক্ষ করেছি, এতে আমরা ভুক্তভোগীও হয়েছি। সংস্থাটির নিজস্ব গঠনতন্ত্রে মানবাধিকারকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও ফিলিস্তিনি ফুটবলের ক্ষেত্রে সেই নীতির বাস্তবায়নে ফিফা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে বসবাসকারী দলগুলোকে অধিকৃত ও দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে লিগ ম্যাচ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ার কারণে ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (আইএফএ) স্থগিত করার জন্য ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) করা দাবিও ফিফা বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।

ফিফা ফিলিস্তিনি ফুটবলারদের গণহত্যা ও পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনায় কখনও নিন্দা জানায়নি। আটক ফুটবলারদের মুক্তির দাবিও তারা তোলেনি। সর্বশেষ ফিলিস্তিন নারী ফুটবল দলের সদস্য র‌্যান্ড হালাওয়ানি ও নাতালি আবু দাইয়েহও আটক হয়েছেন। ফিলিস্তিনি ফুটবল স্টেডিয়াম ধ্বংসের বিরুদ্ধেও তারা কোনো প্রতিবাদ জানায়নি।

এমনকি ফিলিস্তিনি ফুটবলের ওপর আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ, যেমন দলগুলোর ভ্রমণ অনুমতি প্রত্যাখ্যান বন্ধ ইত্যাদিতে ইসরায়েলের ওপর কোনো কার্যকর চাপও সৃষ্টি করেনি। ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আইএফএ) কেবল বর্ণবাদ, বর্ণবৈষম্যমূলক শাসন এবং দখলদারিত্বকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং গাজা ও লেবাননে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধে ইসরায়েলি ফুটবলারদের অংশগ্রহণকে অভিনন্দন জ্ঞাপন চেষ্টায়ও অংশ নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও জাতিসংঘের বিভিন্ন রেজুলেশনে স্পষ্টভাবে রায় দেওয়া সত্ত্বেও ফিফা ফিলিস্তিনিদের দাবিকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে জটিল বিষয় হিসেবে দাবি করছে অব্যাহতভাবে। এভাবে এখনও ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের চূড়ান্ত সমাধান ঝুলে আছে। এটি মূলত ইসরায়েলপন্থি বক্তব্যকে সমর্থন করারই নামান্তর, যা ট্রাম্প প্রশাসনও গ্রহণ করেছিল তাদের মিত্র ইসরায়েলকে রক্ষা করতে এবং ফিলিস্তিনি ভূমি দখলকে বৈধতা দিতে।

যেভাবে ইসরায়েল পর্যটন, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্ম, কৃষি ও অন্যান্য ক্ষেত্রকে ব্যবহার করে অবৈধ দখলকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছে, ঠিক একইভাবে তারা ফুটবলকেও সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। এটি ফিফার সমর্থনও পেয়েছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডে ফিফার সম্পৃক্ততা আরও বিস্তৃত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো যথার্থভাবেই ইনফান্তিনোর কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে উত্থাপন করেছে। তাদের অভিযোগ, তিনি ‘পূর্ণ জ্ঞাতসারে এমন কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেছেন, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন, বর্ণবাদী বৈষম্য এবং যুদ্ধাপরাধের শামিল’ এবং এ বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন ও চিঠি তিনি উপেক্ষা করেছেন।

ফিফা নেতৃত্ব শুধু ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ও ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (আইএফএ) ভূমিকা নিয়ে নীরব ও নিষ্ক্রিয়ই থাকেনি; বরং সেগুলোকে আড়াল করার চেষ্টাতেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। গত মাসে ফিফা প্রস্তাব দেয়, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার’ লক্ষ্যে একটি অনূর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে মুখোমুখি করা হোক। এর কয়েক সপ্তাহ আগে ইনফান্তিনো ব্যক্তিগতভাবে ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) প্রধানকে তার ইসরায়েলি সমকক্ষের সঙ্গে করমর্দন করতে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

ফিফা এভাবে তার নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থার চরিত্র হারিয়েছে, যদিও তাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলার কথা। ফিফা এমন রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সমর্থন করছে।

ফেব্রুয়ারি মাসে ইনফান্তিনো বিতর্কিত ‘বোর্ড অব পিস’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছে, যে বোর্ড চাইছে ফিলিস্তিন বিষয়ে জাতিসংঘ যুক্ত না হোক; তারা ইসরায়েলি গণহত্যা বন্ধ ও ইসরায়েলি দখলদারিত্ব শেষ করার যে কোনো আন্তর্জাতিক আইনি প্রচেষ্টা বন্ধ করতে চায়। ফিফার আচরণে এটি মানুষের আস্থা হারাচ্ছে। এ অবস্থায় এটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ভাবমূর্তির জন্য মর্যাদাহানিকর। কারণ ক্রীড়ার কোনো ভেদরেখা নেই। এটি সবাইকেই অন্তর্ভুক্ত করে। 

জাবিয়ার আবু ঈদ: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী; আলজাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×