ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

জাতীয় ঐক্য বনাম বিভেদের রাজনীতি

জাতীয় ঐক্য বনাম বিভেদের রাজনীতি
×

জাহেদুল আলম হিটো

জাহেদুল আলম হিটো

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১০:১০

জাতীয় ঐক্যের সংকট হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে দেশের সব নাগরিক ও রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়ে একমত হতে পারে না। এর মূল কারণগুলো হলো রাজনৈতিক মতভেদ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভেদ, আইনের শাসন না থাকা ইত্যাদি।

আবার অঞ্চল, ভাষা, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক অনৈক্যের মোকাবিলাও করতে হয় রাষ্ট্রকে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার লোভও জাতীয় ঐক্যে বাধা হিসেবে কাজ করে। অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে জনসাধারণের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভও জাতীয় ঐক্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভেদের কারণে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও দূরত্বও জাতীয় ঐক্যকে বিঘ্নিত করে। সবার জন্য সমান আইন ও সুশাসনের অভাবেও মানুষ হতাশ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর জাতীয় ঐক্যের সংকটে উন্নয়ন থমকে যায়; শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট হয়; আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাষ্ট্রের শক্তি কমে যায়। 

জাতীয় ঐক্যের সংকট মোকাবিলায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া মতবিনিময়, আলোচনা বা সংলাপের মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝি দূর করা; দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের সৎ ও নিষ্ঠাবান হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। জাতীয় ঐক্য নৌকার মতো। সবাই মিলে একসঙ্গে না বাইলে নৌকা এগোয় না। কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্রে সব মানুষের ঐক্য কি সম্ভব? 

জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তেমন বিভক্তি না থাকলেও কিছু কিছু আরোপিত বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। অঞ্চল, ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, রুচি, মনন, জাতীয়তা ইত্যাকার বিষয়ে অসাধারণ ঐক্য ও বৈচিত্র্য থাকলেও কৃত্রিম কিছু বিভেদ রেখা টেনে আনার বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রয়াস বাংলাদেশে নতুন নয়। এর মধ্যে ‘জয় বাংলা’ এবং ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বিতর্ক বিশেষ উল্লেখযোগ্য। 

মহান মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ আর স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের স্থায়িত্বের দৃঢ় উচ্চারণ হচ্ছে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। যারা উর্দু শব্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাদের জ্ঞাতার্থে বলে রাখা ভালো, বাংলা ব্যাকরণে বিদেশি শব্দ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। ব্যাকরণগতভাবেও ‘জিন্দাবাদ’ শব্দটি বাংলা শব্দ হিসেবেই স্বীকৃত, যার অর্থ ‘দীর্ঘ জীবন’। স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের দীর্ঘ জীবনই সবার কাম্য। আসলে এ দুটো স্লোগানে কেবল কালের পার্থক্য ছাড়া কোনো বিভক্তি নেই। 

জয় বাংলা ও জিন্দাবাদ বিতর্ক ছাড়াও প্রায় একই ভূগোল, ভাষা, খাদ্যাভ্যাসের এ দেশে বাঙালি বনাম বাংলাদেশি, সাম্প্রদায়িকতা বনাম অসাম্প্রদায়িকতা, বিএনপি বনাম আওয়ামী লীগ, ভারতীয় জুজু বনাম পাকিস্তানি ভূত, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বনাম বিপক্ষ শক্তির নামে অতীতে বিভেদ ছড়ানো হয়েছে। 

এখনও মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেও মুখোমুখি করার নামে যে বিভক্তি, ঘৃণা, হিংসা ছড়ানো হচ্ছে তা ভয়াবহ। বৈচিত্র্য, পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভিন্নমত, সহমত, বিতর্ক, আলোচনা গণতন্ত্রের বিশেষ অনুশীলন। যারা অগণতান্ত্রিক তারা ঘৃণার রাজনীতি ছড়ায়। ঘৃণার সংস্কৃতি জাতিকে বিভক্ত করা ছাড়া কোনো অগ্রগতি সাধন করতে পারে না।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং সব পক্ষকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি সবার প্রধানমন্ত্রী।’ যারা ভোট দিয়েছে, যারা ভোট দেয়নি, সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এটাই জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি। গণতন্ত্রে দলের প্রধানমন্ত্রী হন না; হন দেশের প্রধানমন্ত্রী। 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা ‘পুনর্মিলন’ হলো প্রতিশোধের রাজনীতি ও মেরূকরণ ভুলে পারস্পরিক সমঝোতা, শান্তি এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া। এটি অতীতে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও রাজনৈতিক সংঘাতের সত্য উন্মোচন করে, দেশের সব রাজনৈতিক দল ও নাগরিককে নতুন গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে নেওয়ার উপায়। 

বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল প্রায়ই সংঘাতময় ও প্রতিশোধমূলক হয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের অনাস্থা, সহিংসতা এবং দমন-পীড়ন দেশকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের আগের মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও দুর্নীতির পেছনের সত্য উন্মোচন করতে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ বা ‘সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো একটি কমিশন গঠনের মাধ্যমে অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছিল সেখানে। এখনও সেটা সম্ভব। 

বস্তুত রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে হানাহানি বন্ধ করে দেশের উন্নয়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বারবার। রাজনৈতিক দল ও বিরোধী শিবিরের মধ্যেও পারস্পরিক সমঝোতা ও আইনের শাসনের মাধ্যমে ঐক্যের পথ খোঁজার গুরুত্বও বেড়েছে। অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার ও সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনা, দলের চেয়ে দেশকে প্রাধান্য দিয়ে সুস্থ রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করা জরুরিও বটে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দেশে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্যও রিকনসিলিয়েশন সময়ের দাবি। জাতীয় ঐক্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ত্বরান্বিত হোক। 

জাহেদুল আলম হিটো: রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী 

আরও পড়ুন

×