অসম্পূর্ণ চার প্রকল্পের সুবিধাবঞ্চিত পৌরবাসী
আবু জাফর সালেহ, বরগুনা
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বরগুনা পৌরসভায় নির্মাণাধীন চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এতে করে ৪০ কোটি ১৫ লাখ টাকার প্রকল্পগুলোর ফল একেবারেই শূন্য। সচেতন পৌর নাগরিকরা বলছেন, প্রকল্পগুলোতে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাসহ বিভিন্ন কারণে কাজ শেষ করা যায়নি। এ কারণে সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসছে না এসব প্রকল্প। তবে পৌরসভা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
টাউন হল এখন খোঁয়াড়
সভা-সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে সুবিধার জন্য বরগুনা পৌর শহরে সিরাজউদ্দীন সড়কে ৫০০ আসনবিশিষ্ট টাউন হল মিলনায়তন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের মার্চ মাসে। সাত কোটি দুই লাখ টাকা খরচে ধরা হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের মার্চে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ২০২২ সালের দিকে প্রায় ৮০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরপর নির্বাচনে মেয়রের পরিবর্তন, রাজনৈতিক বিরোধ ও নির্ধারিত বরাদ্দের টাকা অন্যখাতে খরচ করায় থেমে যায় কাজটি। তারপর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে আছে মিলনায়তনটি। নির্মাণাধীন ভবনের দরজা-জানালা খুলে নিচ্ছে স্থানীয় দুর্বৃত্তরা। এটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেই পৌর কর্তৃপক্ষের।
খেলাঘর বরগুনা জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রাসেল মাহমুদ বলেন, সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিকাশের উদ্দেশ্যে বরগুনা টাউন হল মিলনায়তন নির্মাণ শুরু হয়েছিল। এখানে প্রতিটি সাংস্কৃতিক
সংগঠনের জন্য একটি করে কক্ষ বরাদ্দ
দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঝপথে থেমে যাওয়ায় সরকারের কোটি কোটি টাকাই শুধু খরচ হয়েছে; সাংস্কৃতিক সংগঠন অথবা পৌরবাসীর কোনো উপকারে আসেনি।
জেলা শ্রমিক আন্দোলনের সাবেক সভাপতি গোলাম হায়দার স্বপন বলেন, টাউন হল ভবনটি পুরোপুরি নির্মাণ হলে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রমে অনেক সুবিধা হতো। সাবেক পৌর মেয়র মো. শাহাদাত হোসেন কাজটি শুরু করেছিলেন। ২০২২ সাল নির্বাচিত মেয়র অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে সেই কাজটি শেষ করতে দেননি। এ কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকার ভবন এখন গরু-ছাগলের খোয়ারে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আরিফ অ্যান্ড আসিফ কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মো. আবুল হোসেন খান বলেন, ভবন নির্মাণের কাজ যখন শেষের পথে, তখন এ প্রকল্পে বরাদ্দকৃত টাকা তৎকালীন পৌর মেয়র অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ পৌরসভার প্রকৌশলীদের যোগসাজশে অন্য খাতে নিয়ে খরচ করে ফেলেন। যা কোনোভাবেই তারা পারেন না। যে কারণে পরে কাজ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তারা ৮০ শতাংশ কাজ করেছিলেন জানিয়ে বলেন, ‘প্রকল্পের ওই তহবিলে টাকা জমা দিলে আমি কাজ করে দিব।’
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাছুম বিল্লাহ্ বলেন, কাজ সম্পন্ন করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বারবার চিঠি দিলে তারা কাজ শেষ করেননি। ইতোমধ্যে চার কোটি টাকার মতো বিলও নিয়েছেন ঠিকাদার। এই খাতের টাকা অন্য খাতে খরচের বিষয়টি স্বীকার করে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘কাজ করলে টাকা প্রশাসক অথবা মেয়র যে কোনো জায়গা থেকে ব্যবস্থা করে দেবেন।’
পানির ট্যাংক ও বর্জ্য শোধনাগার
অন্যদিকে ২০১৮ জুলাই মাসে পৌর নাগরিকদের পানি সরবরাহের সুবিধার জন্য ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি উচ্চ জলাধার (পানির ট্যাংকি) নির্মাণ কাজ শুরু করে পৌর কর্তৃপক্ষ। একটি জেলা পরিষদের সামনে, অন্যটি কলেজ রোডে নির্মাণ
করা হয়। দরপত্র অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২০ সালের নভেম্বরে। বেশির ভাগ কাজ শেষ হলেও কিছু আনুষঙ্গিক কাজ বাকি। এ কারণে পানি নিয়ে সংকটে থাকলেও ট্যাংকের সুবিধা পাচ্ছেন না পৌর বাসিন্দারা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকার ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রায় ১৬ কোটি টাকা খরচে পৌর শহরের বাইরে বরগুনা সদর ইউনিয়নের হেউলিবুনিয়ায় একটি বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হয়। ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার পাঁচ বছর পরও সেটি চালু হয়নি। বরগুনা পৌর সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় নির্মিত আধুনিক এ বর্জ্য শোধনাগারটিও পৌর নাগরিকদের কোনো কাজেই আসছে না।
বরগুনা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, পৌরবাসীর সুপেয় পানির সুবিধার্থে চার বছর আগে দুটি ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে পানি পাওয়ার সুযোগ হয়নি নাগরিকদের। এ
ছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায়
নির্মিত বর্জ্য শোধনাগারটিও কোনো কাজে আসেনি। অথচ সড়কের পাশে খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। যেন প্রকৃতি ও পরিবেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
এ বিষয়ে বরগুনা পৌরসভার প্রশাসক সজল চন্দ্র শীল বলেন, পানির ট্যাংক দুটি নির্মাণ হলেও ওই প্রকল্পে আনুষঙ্গিক কিছু কাজের বরাদ্দ ছিল না। ফলে অর্থ সংকটের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও চালু করা যায়নি। অন্যদিকে বর্জ্য শোধনাগারটিও জনবল সংকটের কারণে চালু করা যাচ্ছে না। প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পৌর নাগরিকদের ভোগান্তির কথা স্বীকার করেন তিনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনারও আশ্বাস দেন।
- বিষয় :
- পৌরসভা