ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

১৫০ কোটি টাকার শিল্পনগরীতে কাশবনের রাজত্ব

১৫০ কোটি টাকার শিল্পনগরীতে কাশবনের রাজত্ব
×

চার বছর পরও ফাঁকা পড়ে আছে ১৫০ কোটি টাকার রাজশাহী বিসিক শিল্পনগরী-২। কারখানার কর্মচাঞ্চল্যের বদলে এলাকাজুড়ে এখন শুধু কাশবন আর ঝোপঝাড়ের নীরব বিস্তার। সম্প্রতি তোলা সমকাল

 সৌরভ হাবিব, রাজশাহী

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

উদ্বোধনের চার বছর পেরিয়ে গেলেও রাজশাহীর বিসিক শিল্পনগরী-২ এখনও প্রত্যাশিত শিল্পাঞ্চলে পরিণত হতে পারেনি। প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা এ শিল্পনগরীর ২৮৬টি প্লটের মধ্যে এখন পর্যন্ত বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৭৭টি। অর্থাৎ ৭৩ দশমিক ০৮ শতাংশ প্লটই এখনও ফাঁকা। বরাদ্দ পাওয়া প্লটগুলোর মধ্যেও শিল্প উৎপাদন শুরু হয়েছে মাত্র তিনটিতে। অধিকাংশ প্লটে কাশবন ও ঝোপঝাড় গজিয়ে উঠেছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, শিল্পনগরীতে এখনও গ্যাস সংযোগ নেই। পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বিদ্যুৎ সংযোগ পেতেও নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। এর সঙ্গে প্লটের দাম আশপাশের বাজারদরের তুলনায় বেশি হওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

ক্ষোভ প্রকাশ করে উদ্যােক্তারা বলেন, সপুরা এলাকায় ৩২৯টি প্লট নিয়ে ১৯৬২ সালে রাজশাহী বিসিক ১ চালু হয়। এখানে শিল্প কারখানা রয়েছে ২০৪টি। ৫টি কারখানা রুগ্ণ অবস্থায় পড়ে বন্ধ আছে। এখানেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট পুরোপুরি সমাধান হয়নি। এ অবস্থার মধ্যেই চালু করা হয় বিসিক শিল্পনগরী-২ শিল্পনগরী। 
গত রোববার বিসিক শিল্পনগরীতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় ঘন কাশবন ও জঙ্গল। বোঝার উপায় নেই এটা শিল্প অঞ্চল। প্রতিবছর বিসিক কর্তৃপক্ষ টেন্ডার দিয়ে এসব কাশবন বিক্রি করে। বিসিক-২ প্রধান ফটক পেরিয়েই রাখা হয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট। তবে সেখানে কোনো কার্যক্রম নেই। একটু সামনে এগোতেই দেখা মিলছে সারি সারি প্লট। প্রতিটি প্লটেই ফুটেছে নানারকম বনফুল। কোথাও কোথাও প্লটের সীমানা বোঝাই কঠিন। শিল্পকারখানার পরিবর্তে পুরো এলাকায় বিরাজ করছে নির্জনতা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, উদ্বোধনের সময় প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা এটিকে উত্তরাঞ্চলের নতুন শিল্পায়নের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। সে সময় উদ্যোক্তাদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, অভ্যন্তরীণ সড়ক, পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। চার বছর পর সরেজমিন দেখা গেছে, গ্যাস সংযোগ এখনও চালু হয়নি, পানি সরবরাহ পুরোপুরি কার্যকর নয়, ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ হয়নি। শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো দৃশ্যমান অবকাঠামোও গড়ে ওঠেনি। ফলে উদ্বোধনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির বড় অংশই এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
রাজশাহী মেটাল ফাউন্ড্রির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ সালাউদ্দীন বলেন, ‘বিদ্যুৎ সংযোগ আবেদন করলে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু গ্যাস কবে আসবে, কেউ বলতে পারছে না। সাবস্টেশন নির্মাণের কথাও অনেক দিন ধরে শুনছি, কিন্তু দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।’
তিনি বলেন, ‘শহরের বাইরে হওয়া সত্ত্বেও এখানে প্রতি বর্গফুট প্লটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার ১৩৬ টাকা ২৭ পয়সা। প্রতি কাঠা প্লটের দাম প্রায় ৮ লাখ ১৮ হাজার টাকা। আশপাশের জমির তুলনায় এটি অনেক বেশি। তাই উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন।’

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মহায়মিনুল হক বলেন, ‘পানির লাইন আছে, কিন্তু সংযোগ নেই। আবেদন করার পর দেড় মাসে সংযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনও পানি পাইনি।’ আরেক উদ্যোক্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজশাহীতে কার্গো বিমান নেই, আবার সরাসরি রাজশাহী-চট্টগ্রাম রেলসংযোগও নেই। ফলে বড় বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হচ্ছেন না।’
রাজশাহী শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আহমেদ জাকী বলেন, ‘শিল্পনগরীটি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়নি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বিবেচনায় প্লটের আকার ও দাম নির্ধারণ করা উচিত ছিল।’
উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ড. রোজেটি নাজনীন বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট রাখা হলেও পুঁজি ও সহজ ঋণ না থাকায় তারা বিনিয়োগ করতে পারছেন না।’
বিসিকের আঞ্চলিক পরিচালক জাফর বায়েজীদ বলেন, ‘খুব দ্রুত অবশিষ্ট প্লট বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পাশাপাশি ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধনের মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারাও এখন আবেদন করতে পারবেন। প্লটগুলো বরাদ্দ হয়ে গেলে গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।’ প্লটের দাম বেশি হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুরুতে দাম বেশি মনে হলেও শিল্প কার্যক্রম শুরু হলে জমির দাম আরও বেড়ে যাবে। বর্তমান দাম স্বাভাবিক।’

আরও পড়ুন

×