নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই গোপনে স্বজনদের নিয়োগ
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ট্রাস্ট (বাংলাদেশ)-এর অধীন ‘লালমনিরহাট আল-নাহিয়ান শিশু পরিবার’ এবং ঢাকা মিরপুর অফিসে বিভিন্ন পদে নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোনো প্রকার উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ বোর্ড গঠন কিংবা পরীক্ষা ছাড়াই ট্রাস্টের প্রবিধানমালা টপকে বিভিন্ন পদে ১০ থেকে ১৩ প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছেন সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নূরুজ্জামান আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বগুড়া আজিজুল হক কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বর্তমানে ট্রাস্টের উপ-তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল হাকিম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক মন্ত্রী নূরুজ্জামান আহমেদের সরাসরি নির্দেশে ২০১৮ সালে লালমনিরহাট আল-নাহিয়ান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র আট হাজার টাকা বেতনে খণ্ডকালীন
শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন আদিতমারী-কালীগঞ্জের উত্তর মুসরত মদাতী গ্রামের আব্দুল হাকিম। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ৭ জুন কোনো পরীক্ষা ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তাঁকে ‘উপ-তত্ত্বাবধায়ক’ পদে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়। তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক কে বি এম ওমর ফারুখ চৌধুরী স্বাক্ষরিত আদেশে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, সমাজকল্যাণমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে এ আদেশ জারি করা হলো।
উপ-তত্ত্বাবধায়ক পদে যোগদানের পর আব্দুল হাকিম সাবেক মন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। প্রবিধানমালা পাশ কাটিয়ে ট্রাস্টের বনানী, মিরপুর ও লালমনিরহাট শিশু পরিবারের বিভিন্ন পদে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে স্বজন ও পছন্দের লোকদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে আব্দুল হাকিমের স্ত্রী, দুই ভাইয়ের বউ, মামাতো-খালাতো বোনসহ একাধিক নিকটাত্মীয় রয়েছেন। গত ৫ আগস্টের পর ট্রাস্টের কর্মচারীদের তোপের মুখে তিন মাস অফিসে অনুপস্থিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে পুনরায় কর্মস্থলে ফেরেন তিনি।
শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ট্রাস্টের প্রবিধানমালা ২০০৬ অনুযায়ী, উপ-তত্ত্বাবধায়ক পদের জন্য স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্ম বা সমাজবিজ্ঞানে দ্বিতীয় শ্রেণির স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ আব্দুল হাকিম ২০১৫ সালে ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে সিজিপিএ ২.৭৫ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। যোগ্যতার শর্ত না থাকলেও সাবেক মন্ত্রীর অনৈতিক চাপে কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়।
আব্দুল হাকিমের নিয়োগসহ ট্রাস্টের সব অবৈধ নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়ে সমাজকল্যাণ ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী এবং জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার ভোলার চওড়া গ্রামের চাকরিপ্রার্থী রাসেল হক। অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২২ জুলাই জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) রকিবুল হাসানকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটিকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
অভিযোগকারী রাসেল হক জানান, দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি চাকরির সন্ধান করছিলেন। কিন্তু আল-নাহিয়ান শিশু পরিবারে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই চলতি বছর শিক্ষকসহ ১১টি পদে আব্দুল হাকিমের প্রভাব খাটিয়ে তাঁর আত্মীয়দের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই তিনি লিখিত অভিযোগ জানান।
আল-নাহিয়ান ট্রাস্টের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক কে বি এম ওমর ফারুখ চৌধুরী অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘আব্দুল হাকিমের নিয়োগ পুরোপুরি অবৈধ। কোনো বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা বা বোর্ড গঠন ছাড়াই সাবেক মন্ত্রী নূরুজ্জামান আহমেদের চরম চাপে তাঁকে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। অন্য কোনো নিয়োগেও প্রবিধানমালা মানা হয়নি।’
সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপ-তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল হাকিম দাবি করেন, প্রবিধানমালা মেনেই তাঁর নিয়োগ হয়েছে। সাবেক নির্বাহী পরিচালক ওমর ফারুখ তাঁর সম্পর্কে অসত্য তথ্য দিয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিষটি তিনি সাক্ষাতে নথিপত্রসহ দেখাবেন। তবে নিজ স্ত্রী ও দুই ভাইয়ের বউয়ের চাকরির বিষয়টি স্বীকার করেন। এ বিষয়ে আব্দুল হাকিমের ভাই মোতালেব তাঁর স্ত্রীর চাকরির কথা স্বীকার করলেও অন্য বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান জানান, লিখিত অভিযোগটি আমলে নিয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
- বিষয় :
- শিশু