আলো ছড়াতে গিয়ে শঙ্কায় কলেজ শিক্ষকের জীবন
শিক্ষক আরিফুল ইসলাম
আনোয়ার হোসেন স্বপন, লালমনিরহাট
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১০:০৯
অনলাইনের জুয়ায় নিঃস্ব হচ্ছে কিশোর-তরুণরা। তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। লালমনিরহাটের আদিতমারীতে এমন চক্রের বিরুদ্ধে মাঠে নামেন শিক্ষক আরিফুল ইসলাম (৩৪)। জুয়া পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের সতর্ক করেন। সচেতন করেন জুয়ায় জড়িয়ে পড়া কিশোর-তরুণদের।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে জুয়া পরিচালনাকারী চক্র। তাদেরই হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় ১০ দিন ধরে হাসপাতালে আছেন আরিফুল ইসলাম। তাঁর জ্ঞান ফেরেনি গতকাল রোববার পর্যন্ত। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে ছেলেসন্তানের জন্ম দিয়েছেন আরিফুলের স্ত্রী মাকামাম মাহমুদা শম্পা। এর মধ্যে পরিবারকে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে মামলার আসামিরা।
আদিতমারীর দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে আরিফুল ইসলাম। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মেধাবী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ফলিত রসায়নে। পরে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জেলাজুড়ে মাদক, জুয়া বাল্যবিবাহসহ নানা সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য কয়েক দশক আগে ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ নামে সংগঠন গড়ে তোলেন জেলার সচেতন ব্যক্তিরা। সম্প্রতি সেই সংগঠনে সম্পৃক্ত হন শিক্ষক আরিফুল ইসলাম। এলাকায় মাদক ও অনলাইন জুয়াবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন তিনি। কিছু দিন আগে গন্ধমরুয়া এলাকার চিহ্নিত জুয়াড়ি রহিদুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীদের জুয়ার কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে বলেন। পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে তারা।
গত ১ আগস্ট বিকেলে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিলেন আরিফুল। বাড়ির কাছাকাছি এলে রহিদুলের নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। মাথায় এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আরিফুলকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। তাঁকে উদ্ধার করে শুরুতে নেওয়া হয় লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয় তাঁর। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে আরিফুলকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। স্বজন জানিয়েছেন, সেখানেও অস্ত্রোপচার করা হয়েছে তাঁর। আরিফুলের মাথার পেছনে ও মাঝে গভীর ক্ষত রয়েছে। পেছনের দিকেই সেলাই লেগেছে ১৯টি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক।
হামলার পরদিন রাহিদুলকে প্রধান আসামি করে ছয়জন অনলাইন জুয়া ব্যবসায়ীসহ ১০ জনের নামে আদিতমারী থানায় মামলা করেন আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক। গতকাল রোববার পর্যন্ত কোনো আসামিকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এদিন দুপুরে লালমনিরহাটের মোগলহাট টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায় মানববন্ধন করেছেন এলাকার সর্বস্তরের লোকজন। সেখানে আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনোর আসর বসিয়ে এলাকার যুবকদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে জুয়াড়ি চক্র। জুয়ার কারণে একাধিক মারামারি ও চুরি ঘটেছে। তাঁর ছেলে আরিফুল জুয়া বন্ধের জন্য জুয়াড়িদের শাসন করেছিল। এতে করে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। এর জেরেই তাঁর ছেলেকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করেছে তারা। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
স্ত্রীর কোলে এসেছে ছেলে
আরিফুল যখন আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখনই তাঁর স্ত্রী মাকামাম মাহমুদা শম্পা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এক ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। নবজাতককে নিয়ে তিনি রংপুরের একটি ক্লিনিকে আছেন। এই অবস্থায় পরিবারটিতে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।
লালমনিরহাট সরকারি পলিটেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ইসরাইল হোসেন সমকালকে বলেছেন, এ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করতে হবে। তারা আহত শিক্ষকের চিকিৎসার খোঁজখবর রাখছেন।
চিকিৎসার খরচ নিয়ে উদ্বেগ
এদিকে আরিফুলের চিকিৎসায় ২০-২৫ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, লালমনিরহাট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ সহকারী অধ্যাপক এস এম আবু হাসনাত রানা। তিনি বলেন, পরিবারের পক্ষে বিপুল টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জেলা সমিতিসহ দু্য়েকটি সংগঠন এগিয়ে এসেছে। তবে তাদের সহায়তাও পর্য়াপ্ত নয়। এ কারণে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিত।
প্রধান আসামি রহিদুল পলাতক থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আদিতমারী থানার ওসি নাজমুস সাকিব সজীব বলেন, ঘটনার পরপরই মামলা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছেন। পলাতক প্রধান আসামি রহিদুলসহ জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে একাধিক দল অভিযান শুরু করেছে।
- বিষয় :
- লালমনিরহাট