বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্প
বরাদ্দ জটে আটকা সাড়ে ৪ কোটি টাকার প্রকল্প
খোলা জায়গায় বর্জ্যের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ মানুষ। উলিপুর পৌরসভার নাওডাঙ্গা বিল এলাকা। ছবি: সমকাল
মোন্নাফ আলী, উলিপুর (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫২
উলিপুর পৌরসভার বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপনের ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকার প্রকল্পটি। ফলে বাধ্য হয়ে খোলা জায়গায় পৌর বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে বর্জ্যের তরল অংশ পাশের বিলে মিশে মাছের মৃত্যু, ধান চাষ বন্ধ, দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব এবং নানা রোগব্যাধির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে চার গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
সরেজমিন নাওডাঙ্গা বিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যেখানে আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার হওয়ার কথা ছিল, সেখানে কেবল ভিত্তি পড়ে আছে। তার পাশেই স্তূপ করে ফেলা হচ্ছে পৌরসভার দৈনিক বর্জ্য। বৃষ্টির পানির সঙ্গে সেই বর্জ্য বিলে ছড়িয়ে পড়ছে। দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
নাওডাঙ্গা গ্রামের আব্দুল গনি মেম্বার বলেন, শোধনাগারের জন্য জমি বিক্রি করে এখন অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন। আগে এই বিলে মাছ ও ধান চাষ করে বছরে লাখ লাখ টাকা আয় হতো। এখন বর্জ্যে পানি দূষিত হয়ে যাওয়ায় মাছ চাষ ও কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ। জমির মালিক ও সাবেক কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, জনস্বার্থে জমি দিয়েছিলেন। কিন্তু শোধনাগার না হয়ে উল্টো বর্জ্যের ভাগাড় তৈরি হওয়ায় চার গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে।
স্থানীয় নজরুল মাস্টার, তৈয়বুর রহমান ও নুর হোসেন বলেন, প্রায় ২০ একর বিলজুড়ে সমবায় ভিত্তিতে মাছ ও আমন ধানের চাষ হতো। এখন সেই বিল প্রায় অকেজো। বাকরেরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিফন মিয়া জানায়, দুর্গন্ধের কারণে নাক চেপে রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হয়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের ২৩টি পৌরসভার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) অর্থায়নে ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালে দরপত্রের মাধ্যমে কুড়িগ্রামের এস এম আদিল এন্টারপ্রাইজ কাজ পায়। ২০২২ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জমি পরিবর্তনের কারণে নকশা সংশোধন করতে হয়। পরে সংশোধিত নকশা অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ অনুমোদন না পাওয়ায় ঠিকাদার বিল না পেয়ে কাজ বন্ধ করে দেন।
উলিপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম বলেন, জমি অধিগ্রহণের কাজ পৌরসভা করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। কাজ শেষ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে ওই এলাকাতেই বর্জ্য ফেলতে হচ্ছে। এতে পরিবেশ ও জনদুর্ভোগ বাড়ছে। প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করতে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, প্রথমে পতিত জমির জন্য নকশা করা হয়েছিল। পরে নিচু জমিতে স্থান পরিবর্তন করায় নকশাও পরিবর্তন করতে হয়। সংশোধিত ব্যয়ের অনুমোদন না আসায় ঠিকাদারের বিল পরিশোধ সম্ভব হয়নি।
মেসার্স আদিল এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি আমিনুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত বরাদ্দ অনুমোদন পেলেই কাজ পুনরায় শুরু করা হবে। কুড়িগ্রাম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশিদ বলেন, জমি পরিবর্তন, বিদ্যুতের খুঁটি অপসারণ এবং সংশোধিত ব্যয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় কাজ বিলম্বিত হয়েছে। অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক এটিএম আরিফ বলেন, নকশা পরিবর্তনের অনুমোদন পাওয়া গেছে। এখন অর্থ বরাদ্দ পেলেই নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
- বিষয় :
- কুড়িগ্রাম