ঢাকা বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

সিলেটে ট্রিপল মার্ডার

মামলার শুনানির আগে খুন, বন্ধ ছিল সিসি ক্যামেরা, গায়েব কাগজপত্র

মামলার শুনানির আগে খুন, বন্ধ ছিল সিসি ক্যামেরা, গায়েব কাগজপত্র
×

নিহত ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম

মুকিত রহমানী, সিলেট

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:৪৯ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:০৪

সিলেট নগরের রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার একটি বাসা থেকে সাবেক কয়লা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সকালে তিনজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, হত্যার কারণ সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। এ সুযোগেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

এছাড়া শুনানির আগে সাত্তারকে হত্যার ঘটনায় ওই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কোনো যোগসূত্র আছে কি না তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

জানা যায়, নগরীর রিকাবীবাজারে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণ নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ ও মামলা চলছে। গির্জা সমিতির কাছ থেকে অন্যদের মত সেখানে জায়গা লিজ নিয়ে বাসা ও স্থাপনা নির্মাণ করেন এক সময়ের ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার। ২০২৩ সালে তিনি একটি স্বত্ব মামলা করেন। সেই মামলায় আদালত আদেশ প্রদান করলে আদেশের বিরুদ্ধে বিবাদী সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। সেই মামলার শুনানি হওয়ার কথা আগামী ১৯ আগস্ট। এর আগেই আব্দুস সাত্তারকে খুন করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকালে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালী ১১১ নিকুঞ্জ ভিলার তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। সুরতহাল প্রতিবেদনেও এসব আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের দেয়াল ও বাথরুমের বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ রয়েছে। সাত্তারের কক্ষের তিনটি ওয়ারড্রোবও তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া গেছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মেঝেতে একটি দলিলের কপি পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। ফলে বাসার সিসিটিভি ক্যামেরাও বন্ধ ছিল। তবে পুলিশ বলছে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগেই কেউ বাসায় ঢুকে থাকতে পারে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন সম্ভাব্য কারণ সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। রিকাবীবাজারের জায়গা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে তিনজনকে আঘাত করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি। বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রোব খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে।

নিহত আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক বলেন, রিকাবীবাজারের জায়গা নিয়ে সাত্তার ২০২৩ সালে স্বত্ব মামলা করেন। মামলাটি ছিল স্বত্ব মামলা নম্বর ২১১/২৩। আদালতের আদেশের পর ওই মামলার বিবাদী সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সাত্তারকে বিবাদী করে সিভিল রিভিশন মামলা করেন, যার নম্বর ৭০/২৩। আগামী ১৯ আগস্ট ওই মামলার শুনানির তারিখ ছিল।

তিনি বলেন, প্রতিটি শুনানিতে আব্দুস সাত্তার আদালতে হাজিরা দেন। দুই সপ্তাহ আগেও শুনানির দিনে আসেন। ওই দিন সিরাজুল ইসলাম তাকে হুমকিও দেন, খারাপ ব্যবহার করেন।

নিহতের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের কারণে পরিকল্পিতভাবে আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। রিকাবীবাজারের জায়গার বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের একটি সম্ভাব্য সূত্র হিসেবে দেখার দাবি জানান তিনি।

আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন। তার চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে দুজন যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুজন যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।

নিহত দম্পতির আত্মীয় মুন্না মিয়া বলেন, মামা-মামি বাসায় একাই থাকতেন। তাদের সঙ্গে একজন গৃহকর্মী থাকতেন। বুধবার সকাল নয়টার দিকেও তাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। এরপরই তাদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।

নিহত দম্পতির সন্তানরা বিদেশে থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তারা দেশে ফিরছেন বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন

×