ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংঘর্ষে বৃদ্ধ নিহত হওয়ার জেরে অর্ধশত বাড়িতে লুট

সংঘর্ষে বৃদ্ধ নিহত হওয়ার জেরে অর্ধশত বাড়িতে লুট
×

শরীয়তপুরের জাজিরায় বুধবার রাতে ককটেল বিস্ফোরণের পর ভাঙচুর করা হয় ইউনুস চৌকিদারের পাকা ভবনে। গতকাল বৃহস্পতিবার গজনাইপুরে সমকাল

শরীয়তপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

শরীয়তপুরের জাজিরায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার জেরে অর্ধশতাধিক বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। গত বুধবার রাতে উপজেলার মূলনা ইউনিয়নের গজনাইপুর ও চর গজনাইপুর গ্রামে এই হামলা হয়। এ সময় দফায় দফায় ককটেলের বিস্ফোরণে দুই গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল শিকদারের লোকজন এই হামলায় জড়িত। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মূলনা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল শিকদারের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারসহ নানা বিরোধে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তমিজ খাঁর বিরোধ দীর্ঘদিনের। গত সোমবার সন্ধ্যায় পুরোনো দ্বন্দ্বের জেরে একই ইউনিয়নের লাউখোলা বাজার এলাকায় তাদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, এ সময় শতাধিক ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় উভয়পক্ষ। ককটেলের আঘাতে গুরুতর আহত হন রেজাউলের পক্ষের মান্নান সরদার (৭০)। জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। সংঘর্ষে রিপন মোল্লা (৪৫) নামে একজনের হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত হন অন্তত ১০ জন। 

পুলিশ জানায়, নিহত মান্নান সরদারের ছেলে দিদার সরদার বাদী হয়ে গত বুধবার সকালে জাজিরা থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে ৮৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয় আরও ২৫-৩০ জনকে। সেদিনই এজাহারভুক্ত আট আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। 
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, মামলায় আটজনকে গ্রেপ্তারের পর দুই গ্রামের পুরুষেরা আত্মগোপনে চলে যান। এরই মধ্যে সেখানে লুটপাটের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বুধবার রাত ১০টার দিকে কয়েকশ সশস্ত্র লোক গজনাইপুর ও চর গজনাইপুরে হামলা শুরু করেন। অভিযোগ উঠেছে, তাদের নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপি নেতা রেজাউল শিকদার। রাত ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত তারা দুই গ্রামের ফারুক চৌকিদার, ইউনূস আলী চৌকিদার, ইদ্রিস চৌকিদার, লিটন চৌকিদার, মনরজান বিবি, আজহার চৌকিদার, ওয়াসিম চৌকিদার, উকিল চৌকিদার, জসিম চৌকিদার, বাচ্চু চৌকিদার, শাহজাহান চৌকিদার, রাজ্জাক মাদবর, নূরুল আমিন মাদবর, মোশাররফ চৌকিদারসহ অর্ধশতাধিক বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালান। তাদের কেউ আওয়ামী লীগ নেতা তমিজ খাঁর সমর্থক, কেউ আবার কোনো পক্ষের রাজনীতিতে জড়িত নন। 

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তমিজ খাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, তিনি এলাকায় নেই। চর গজনাইপুরের উকিল চৌকিদার থাকেন মালয়েশিয়ায়। তাঁর স্ত্রী রুবিনা আক্তারের অভিযোগ, ‘রেজাউল শিকদার আমাদের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় রাতে আমাদের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে।’
একই গ্রামের আঁখি আক্তারের স্বামীও প্রবাসী। তিনি বলেন, ‘আমরা মারামারির বিষয়ে কিছুই জানি না। এরপরও আমার ঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। ঘরের সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। এখন আমরা কোথায় থাকব, কোথায় রান্না করে খাবো?’ তাঁর ভাষ্য, কোনো পক্ষের রাজনীতিতেই তাদের কেউ জড়িত নন, তবু হামলার শিকার হয়েছেন।
চর গজনাইপুরের নাজির খান বলেন, ‘একজন মানুষ মারা গেছেন, সেখানে একটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এরপর প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর চালানোও আরেকটি অপরাধ।’ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যারা মামলা বাণিজ্য ও লুটপাট করছে তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। 

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল শিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, ‘আমার জানামতে এমন কিছুই হয়নি। তারা নিজেদের মালপত্র নিজেরাই সরিয়ে এখন আমাদের ওপর দায় চাপাচ্ছে।’
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মিরাজ সমকালকে বলেন, সোমবারের ঘটনায় নিহত ব্যক্তির ছেলে বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ঘটনার পর প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টা ঠেকাতে পুলিশ কাজ করছে। বুধবার রাতে বোমা বিস্ফোরণের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ তৎপর হয়েছে। তবে ভাঙচুরের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বলেও জানান তিনি। 

আরও পড়ুন

×