ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

নৌকা বাইচের সেকাল-একাল ও বাইচালদের গল্প

নৌকা বাইচের সেকাল-একাল ও বাইচালদের গল্প
×

বাইচকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন হাজারো মানুষ। ছবি: সমকাল

উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:২৩ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৫১

বাংলার লোকসংস্কৃতি ও প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ধারক নৌকা বাইচ। মুসলিম নবাব-বাদশাদের আমল থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া এই লোকজ খেলাটি কালের বিবর্তনে আগের চেয়ে কমে গেলেও, আজও কিছু উৎসাহী মানুষের হাত ধরে টিকে আছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষাকাল এলেই নদী-নালা, খাল-বিল যখন পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, তখনই বেজে ওঠে নৌকা বাইচের দামামা। হাজারো দর্শকের উল্লাস আর উৎসবমুখর পরিবেশে আজও যখন পানসি নৌকাগুলো জলে ভাসে, তখন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে বাংলার চিরায়ত রূপ। 

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার রামকান্তপুর ঘাটে ফুলজোড় নদীতে এমনই এক উৎসবের আয়োজন করেছিল রামকান্তপুর যুব সংঘ। সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার ১৮টি সুসজ্জিত পানসি নৌকা এই বাইচে অংশ নেয়। নবীন-প্রবীণ বাইচাল, আয়োজক আর বাদ্যযন্ত্রীদের শ্রম ও মেধায় আয়োজিত এই বাইচ যেন প্রাচীন এই লোকজ সংস্কৃতিকেই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। এই বাইচ ঘিরেই উঠে এসেছে বাইচালদের অভিজ্ঞতা, আনন্দ, অর্জন ও ব্যর্থতার নানা অম্লমধুর গল্প।

নৌকা বাইচ শুধুই একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি অনেকের কাছে নেশা ও শখের বিষয়। পাবনার আমিনপুর থানার বস্তাল গ্রামের ৪৫ বছর ধরে বৈঠা টানা প্রবীণ বাইচাল আবুল কালামের গল্পটি তেমনই। ‘বস্তাল একতা এক্সপ্রেস’ পানসির এই বাইচালের বাবা জসির উদ্দিনও ছিলেন নামকরা বাইচাল। বিনোদন আর শখের বশেই তিনি আজও বৈঠা টানেন। নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষের উল্লাস তার নৌকার গতি ও শক্তি যেন দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।

উল্লাপাড়ার শ্রীবাড়ী গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব প্রাচীন বাইচাল ও শিক্ষক মোতালেব হোসেন খানের স্মৃতিতে লুকিয়ে আছে বাইচের সোনালি অতীত। সত্তরের দশকে তিনি বাবার হাত ধরে নৌকায় উঠতেন। সে যুগে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা চাঁদা তুলেই একটি পানসি তৈরি করা যেত, যা বর্তমানে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই বছরও তার এলাকার তিন গ্রামের মানুষ মিলে ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘একতা এক্সপ্রেস’ নামের নতুন পানসি ভাসিয়েছে জলে।

মোতালেব হোসেনের স্মৃতির পাতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে ঢাকার বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌযাত্রার কথা। ৫০ জন বাইচাল নিয়ে ৬০ ফুট দীর্ঘ পানসিতে দুই দিন-দুই রাত বৈঠা টেনেছিলেন তারা। ক্লান্তি দূর করতে গাওয়া হতো সারিগান— ‘আজ আমার বন্ধু নাই ঘরে- উজান বাতাসে শাড়ি ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে...’ কিংবা ‘হাত ছাইড়া দেও সোনার দেওয়ারে...’। চিঁড়া, গুড় আর মুড়ি খেয়ে পথ পাড়ি দিয়ে সেবার তৃতীয় হয়ে একটি রেডিও জিতেছিলেন তারা। সেই অর্জনের আনন্দ আজও তাকে আলোড়িত করে।

বাইচে যেমন আছে বাঁধভাঙা উল্লাস, তেমনি আছে হৃদয়ভাঙা কষ্ট। বর্তমান প্রজন্মের বাইচাল রঘু শেখ শোনালেন সুজানগরে প্রথম হয়ে সোনার নৌকা জেতার গল্প। পুরস্কারটি ছোট হলেও সেই অর্জনের আনন্দ তাদের এতটাই উদ্বেলিত করেছিল যে, বাড়ি ফেরার পথটুকু যেন তারা আনন্দে ভাসছিলেন।

বিপরীতে পাবনার সুজানগরের ‘নিউ শাড়ির ভিটা এক্সপ্রেস’-এর বাইচাল ইসরাইল শেখের কণ্ঠে ঝরে পড়ে এক বুক আক্ষেপ। ২০১৪ সালে বেড়ার যমুনা নদীতে সেমিফাইনালে মাত্র ৫ ফুটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন তারা। সেই হার তাদের এতটাই কাঁদিয়েছিল যে, আয়োজকদের দেওয়া রাতের খাবার না খেয়েই শূন্য পেটে আর ভগ্ন হৃদয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন পুরো দল। সেই ব্যর্থতার ক্ষত আজও তাদের তাড়া করে।

বাইচের এই ঐতিহ্য যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্য হাল ধরছেন নবীনরাও। শাহজাদপুরের বনগ্রামের যুবক আব্দুল আলীম গত ৫ বছর ধরে ‘উড়ন্ত বলাকা’ পানসির বাইচাল। তার কাছে এটি কোনো বাণিজ্যিক বিষয় নয়, বরং বাংলার সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখার এক ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। আলীমের মতো হিরা প্রামাণিক, জহুরুল সরকার, আব্দুল করিম, নান্নু মিয়া, শাহাদত হোসেনের মতো তরুণরা বিশ্বাস করেন, বর্তমান প্রজন্ম হিসেবে এই ঐতিহ্যকে লালন করা তাদের দায়িত্ব।

শিশুবেলায় দাদা-নানার কাছে শোনা বাইচের গল্প যখন বাস্তবে ধরা দেয়, তখন দর্শকদের মুগ্ধতা যেন সীমা ছাড়িয়ে যায়। সাকিব হোসেন, মামুন রেজা ও সুমন আহমেদের মতো কলেজপড়ুয়া দর্শকরা জানান, পড়ন্ত বিকেলে ফুলজোড় নদীর রূপালি জলরাশিতে পানসিগুলোর সারিগান আর বাদ্যের তালে তালে ছুটে চলা এক অভাবনীয় দৃশ্যের জন্ম দেয়। নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষের হইহুল্লোড় আর উল্লাসের এই প্রাণবন্ত রূপ একমাত্র নৌকা বাইচেই দেখা সম্ভব, যা বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অনন্য রত্ন।

আরও পড়ুন

×