ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

তালেবানের পাঁচ বছর: রাষ্ট্র টিকেছে, তবে মূল্য দিতে হচ্ছে আফগানদের

তালেবানের পাঁচ বছর: রাষ্ট্র টিকেছে, তবে মূল্য দিতে হচ্ছে আফগানদের
×

ছবি: মিডল ইস্ট আই

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:২৯

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর পাঁচ বছর পার করেছে তালেবান। এই সময়ে দেশটিতে বিদেশি সেনা নেই, বড় ধরনের সশস্ত্র বিরোধিতাও গড়ে উঠতে পারেনি। তালেবান সরকার দেশটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে। তবে এর বিনিময়ে আফগানিস্তান আরও দরিদ্র, বিচ্ছিন্ন ও দমনমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের ওপর নানা বিধিনিষেধ তালেবান শাসনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

কাবুলে প্রশাসন, ক্ষমতার কেন্দ্র কান্দাহার
তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কান্দাহার থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছেন। গত পাঁচ বছরে তিনি বিদ্রোহী গোষ্ঠী থেকে তালেবানকে একটি কঠোর কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় রূপান্তর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও প্রধান বিচারপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও কান্দাহারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের প্রভাব রয়েছে।

কাবুলে মোল্লা আবদুল গনি বারাদার, সিরাজউদ্দিন হাক্কানি, মাওলভি ইয়াকুব ও আমির খান মুত্তাকির মতো নেতারা দৈনন্দিন প্রশাসন, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছেন। তবে বড় রাজনৈতিক, বিচারিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কান্দাহারের নেতৃত্বের প্রভাবই বেশি।

তালেবান তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে না। পৃষ্ঠপোষকতা, আর্থিক সুবিধা, আদর্শগত আনুগত্য এবং প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে অনুগতদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে। প্রায় ১৫ হাজার নিবন্ধিত মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য ভাতা ও বেতন দেওয়ার ব্যবস্থাও এই নেটওয়ার্কের অংশ।

অর্থনীতিতে গভীর সংকট
ক্ষমতা নেওয়ার পর আফগানিস্তান বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাচ্ছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার আগে সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক অনুদান থেকে আসত। ক্ষমতা পরিবর্তনের পর সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আটকে দেওয়া হয়।

তালেবান সরকার শুল্ক ও খনিজ রয়্যালটি থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে সক্ষম হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার বড় সুফল দেখা যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ এখনো মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মে মাসের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আফগান অর্থনীতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়লেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে ইরান ও পাকিস্তান থেকে ২০২৩ সালের পর ৫০ লাখের বেশি আফগানকে ফেরত পাঠানোয় জনসংখ্যার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

নারীদের ওপর বিধিনিষেধ
তালেবান শাসনের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত দিক নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ। মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের পড়াশোনা ও শিক্ষকতা নিষিদ্ধ। চলাফেরা, চাকরি ও জনজীবনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীরা নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়ছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ও প্রধান বিচারপতি আবদুল হাকিম হাক্কানির বিরুদ্ধে নারীদের ওপর নিপীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে গোপন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে রাখার অর্থনৈতিক প্রভাবও বড়। জাতিসংঘের হিসাবে, নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ সীমিত করার কারণে আফগানিস্তানের বছরে ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ শতাংশ।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি
একসময় তালেবানের ক্ষমতায় ফেরাকে পাকিস্তান নিজেদের জন্য কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু সেই সম্পর্ক এখন গভীর সংকটে। তালেবান পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে- এমন অভিযোগে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে।

পাকিস্তান ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে প্রায় ২৬ লাখ আফগানকে ফেরত পাঠিয়েছে, সীমান্তপথ একাধিকবার বন্ধ করেছে এবং আফগান ভূখণ্ডে পাল্টা বিমান হামলাও চালিয়েছে। অন্যদিকে তালেবান টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

এই পরিস্থিতি তালেবানের জন্য বড় একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যাও তৈরি করেছে। কারণ, গোষ্ঠীটির কট্টরপন্থী অংশ টিটিপির সদস্যদের ঐতিহাসিক মিত্র হিসেবে দেখে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া তালেবানের ভেতরেও রাজনৈতিকভাবে কঠিন।

সংখ্যালঘুরাও চাপে
তালেবান শাসনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপরও চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে শিয়া ও হাজারা জনগোষ্ঠী, যারা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ, নানা ধরনের বঞ্চনার মুখে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিয়া মতবাদের শিক্ষা ও আইনি স্বীকৃতি সংকুচিত হয়েছে। কিছু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং শিয়া আলেমদের নতুন প্রাদেশিক উলামা পরিষদ থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সালাফি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়েছে।

সামনে কী
পাঁচ বছর পর সামরিক ও প্রশাসনিকভাবে তালেবান এখনো শক্ত অবস্থানে। সংগঠিত কোনো বিরোধী গোষ্ঠীর হাতে এমন বিদেশি সমর্থন, ভূখণ্ড বা ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব নেই, যা কাবুলের নিয়ন্ত্রণকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

তবে তালেবানের জন্য বড় ঝুঁকি রয়েছে ভেতরেই। নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে। একই সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার জন্য কর্মসংস্থান, খাদ্য ও জীবিকার ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে উঠছে। বর্তমান অর্থনৈতিক নীতি এই চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।

রাশিয়া, চীন ও মধ্য এশিয়ার প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক তালেবানকে কিছুটা অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের স্বীকৃতি না থাকা এবং কঠোর আদর্শিক শাসনব্যবস্থা দেশটিকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

আরও পড়ুন

×