পিরোজপুরে নেতৃত্বের সংকটে স্থবিরতা কাটছে না বিএনপিতে
বরিশাল ব্যুরো
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
পিরোজপুর জেলা বিএনপিতে নেমে এসেছে সাংগঠনিক স্থবিরতা। মাত্র ৪ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে দল পরিচালিত হলেও বাস্তবে সেখানে সক্রিয় কেবল ৩ জন। তিন মাসের জন্য গঠিত এই আংশিক কমিটির মেয়াদ এক বছর পার হতে চলল; এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।
দীর্ঘদিনের এই সাংগঠনিক ঘাটতি ও স্থায়ী কমিটির অনুপস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও। পিরোজপুর-১ আসনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে পরাজিত হওয়ার নেপথ্যে দলের এই নেতৃত্বহীনতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতাকেই দায়ী করছেন দায়িত্বশীল নেতাকর্মীরা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলা কমিটির জন্য কাউন্সিলরদের ভোট গ্রহণকালে এক পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার জের ধরে ২১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্র থেকে তৎকালীন জেলা আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে নাজিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম খানকে আহ্বায়ক এবং সাবেক ভিপি সাইদুল ইসলাম কিসমতকে সদস্য সচিব করে ৪ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন এলিজা জামান এবং একমাত্র সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন সাবেক জেলা আহ্বায়ক ও বর্তমানে জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন। তবে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন না পাওয়ায় বর্তমানে রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রয়েছেন এলিজা জামান। ফলে কাগজ-কলমে চারজন থাকলেও বাস্তবে তিনজন দিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে জেলার দলীয় রাজনীতি।
নেতাকর্মীদের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ পিরোজপুর-১ আসনের সংসদীয় নির্বাচন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণে আসনটিতে জয়ের সুবর্ণ সুযোগ থাকলেও তা হাতছাড়া হয় বিএনপির। এ আসনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মাসুদ সাঈদীর কাছে হেরে যান বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক জেলা আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন। তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতাদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে-পরে বিলুপ্ত কমিটির দায়িত্বশীল নেতাদের প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা ক্যাডার বাহিনীর অপকর্ম ও সীমাহীন চাঁদাবাজির খবর ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সাধারণ ভোটারদের মাঝে চরম নেতিবাচক মনোভাবের সৃষ্টি হয়। পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটি কিংবা শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো না থাকায় অভিযুক্ত এসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দলগতভাবে কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
একজন প্রবীণ বিএনপি সমর্থক বলেন, ‘নির্বাচনের আগে ও পরে দলের নাম ভাঙিয়ে এক শ্রেণির ক্যাডার বেপরোয়া চাঁদাবাজি চালিয়েছিল। যার প্রভাব সরাসরি ভোটে গিয়ে পড়ে।’
পিরোজপুরে বিএনপির রাজনীতি এখন বহুধা বিভক্ত ও চ্যালেঞ্জের মুখে। জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আকনের মতো জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, কেন্দ্রীয় নেতাদের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালন ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই বললেই চলে। জেলার কেন্দ্রবিন্দু সদর উপজেলায় তিন বছর ধরে স্থায়ী কমিটি নেই। অন্যদিকে নেছারাবাদ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান ওয়াহিদের মৃত্যু এবং নাজিরপুর উপজেলা কমিটির তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গোটা জেলার রাজনীতি থমকে গেছে। সদর আসনে মাসুদ সাঈদী বিজয়ী হওয়ায় মাঠে বিএনপি এখন কৌশলগতভাবেও কোণঠাসা।
নেছারাবাদ উপজেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘তৃণমূলের কর্মীরা চরম হতাশ। নতুন কমিটি না হলে মাঠের কর্মীদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।’
নির্বাচনে পরাজয় ও বর্তমান স্থবিরতার প্রশ্নে সাবেক আহ্বায়ক ও বর্তমান জেলা পরিষদ প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের দায়িত্ব আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের, যা তারা কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অভাবে করতে পারেননি। নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে নিজ দলের একটি বিশেষ অংশের অসহযোগিতাকে ইঙ্গিত করেন তিনি।
অন্যদিকে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. নজরুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে ৪ সদস্যের কমিটি দেওয়া হয়েছিল এবং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে কমিটি সম্প্রসারণ না করার নির্দেশনা ছিল। তবে তিনি নিজেও স্বীকার করেন যে, জেলা পর্যায়ে দলীয় গতিশীলতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটি গতিশীল পূর্ণাঙ্গ কমিটির কোনো বিকল্প নেই।
- বিষয় :
- বিএনপি