রংপুরে চার খুন
দুজনের স্বীকারোক্তি তবু তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন
সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে বিক্ষোভ, তিন দিনের আলটিমেটাম
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকাল সোমবার জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধন, শোক র্যালি ও সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা- সমকাল
হাবিবুর রহমান সোনা, মিঠাপুকুর (রংপুর)
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে তাদের জবানবন্দির পরও হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের দেওয়া ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক তথ্যের কিছু পার্থক্যও সামনে এসেছে।
চারজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধের আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকা ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক। তবে পুলিশ ও স্বজনরা নিহত ব্যক্তিদের মুখমণ্ডল এসিড বা কোনো রাসায়নিকে ঝলসে দেওয়ার যে দাবি করেছিলেন, চিকিৎসকরা তার প্রমাণ পাননি বলে জানিয়েছেন।
চার খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গত রোববার বিকেল ৫টার দিকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তারা। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে দুজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দুজন নিজেদের দায় স্বীকার করায় তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। তবে আদালতে তারা কী বলেছেন, তার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি পুলিশ। ফলে তাদের স্বীকারোক্তির সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
চার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল সোমবার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের শরীরে শ্বাসরোধের আলামত পাওয়া গেছে। মরদেহ কয়েক দিন পড়ে থাকায় পচনের কারণে মুখমণ্ডলে বিকৃতি দেখা দিয়েছে। কিন্তু মুখে এসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চোয়াল ভেঙে দেওয়ার বিষয়টিও ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হয়নি। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামতের জন্য বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলো সিআইডির ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। এর আগে গত রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেছিলেন, নিহত আগামী চক্রবর্তীর গলা ও মুখে রশি পেঁচিয়ে এমনভাবে টানা হয়েছিল যে তার চোখ বেরিয়ে আসে এবং চোয়াল ভেঙে যায়।
তদন্ত নিয়ে ক্ষোভ
দুই আসামির গ্রেপ্তার ও আদালতে স্বীকারোক্তির খবরের মধ্যেই সোমবার রংপুরে বিক্ষোভ করেছেন জিলা স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, দ্রুত দুজনকে গ্রেপ্তার করলেই তদন্ত শেষ হয়ে যেতে পারে না। হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে।
গতকাল দুপুরে জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধনের পর শোক মিছিল বের করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পরে নগরীর কাচারিবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন তারা। কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও অংশ নেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশের দেওয়া হত্যার বর্ণনায় বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই। বিশেষ করে বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কাটার বিষয়, চারজনকে হত্যার সময় আশপাশের কেউ কোনো শব্দ না শোনা এবং হত্যার পর ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখার বিষয়গুলো বিস্তারিত তদন্তের দাবি রাখে।
জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়ে প্রশাসনকে তিন দিনের সময়সীমা দিয়েছেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্তের অগ্রগতি না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাফিয়ার রহমান বলেন, গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের হত্যার ঘটনায় নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। এই নাটক থেকে বেরিয়ে এসে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। আমরা সত্য জানতে চাই।
সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলার বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ওই বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কে কাটল? চারজনকে হত্যা করা হলো, আশপাশের কেউ টের পেল না! এ রকম অনেক বিষয় আছে, সেগুলো ভালো করে তদন্ত না করেই দুজনকে ধরে বলে দিল– এরা খুনের সঙ্গে জড়িত। আমরা এসব বুঝি না।
এদিকে, বিকেলে নগরীর রংপুর প্রেস ক্লাব চত্বরে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে মহানগর নাগরিক কমিটি। মানববন্ধন থেকে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবি জানানো হয়।
শার্ট বিতর্কে দুই ধরনের বক্তব্য
আসামি সিদ্ধার্থ দাসের পরনে থাকা শার্ট এবং গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তার পরনের শার্ট একই রকম হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। তবে পুলিশের দাবি, একই ধরনের শার্ট আলাদা ব্যক্তির পরনে থাকতেই পারে।
আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস বলেন, আমি তো জানি না, কোনো পুলিশের পরনে কী রকম কাপড় ছিল। কিন্তু আমি যখন আমার ছেলেকে ওর কাকার বাসা থেকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি, তখন ওর পরনে ঘিয়া কালারের একটা গেঞ্জি ছিল। আমি তাকে অন্য কোনো কাপড়ও দিইনি।
আসামির শার্টের মিল থাকা নিয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, এটা আড়ংয়ের শার্ট। আড়ং এক মডেলের এক ডিজাইনের এক রঙের একটা শার্ট তৈরি করে না; এটা হাজারটা হতে পারে।
তিনি বলেন, আমার ফোনে এখনও আসামির ছবি আছে। আমরা যখন তাকে নিয়ে আসি, তখনও তার পরনে আমার পরনে থাকা একই রকম শার্ট ছিল।
ঘটনাস্থল থেকে বের হওয়ার সময়
পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ছাদে যায় বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে। এই দুজন ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। সেখানে বাধা দেওয়ায় স্কুলশিক্ষকসহ চারজনকে হত্যা করে তারা। পরে ওই বাসায় দীর্ঘক্ষণ অবস্থান শেষে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
তবে আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার সময় আমার ছেলে বাসায় ভাত খায়। পরে বাইরে বের হয়ে পাশের বাসায় সীমান্ত দাসের কাছে যায়। শুক্রবার বাসায় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নাশতা ও দুপুর দেড়টার দিকে খাবার খায়। শনিবার রাত ৩টার দিকে সিদ্ধার্থকে তার কাকার বাসা থেকে পুলিশের কাছে তুলে দিই।
তবে প্রতিবেশী সীমান্ত দাসের বাবা সুবাস চন্দ্র দাস দাবি করেন, বৃহস্পতিবার রাতে সীমান্ত বাসায় আসার পর সিদ্ধার্থ এসে দেখা করে চলে যায়। রাতে বাসায় থাকার যে দাবি বিনয় দাস করছেন, তা সঠিক নয়।
আরেক আসামি মুগ্ধ দাসের মা সোনা রানী জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তাঁর ছেলেসহ তিনি ও তাঁর মা একসঙ্গে খেয়েছেন। পরে মুগ্ধ তার নিজের ঘরে যায়। শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরে গিয়ে মুগ্ধকে দেখতে পাননি। তবে দুপুরে বাড়ি ফিরলে ফুটবল খেলতে যাওয়ার কথা জানায় মুগ্ধ। মুগ্ধ দাসের বাবা কানু দাস আনুমানিক ১৫ বছর আগে মারা গেছেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট মুগ্ধ।
চার চিতায় শেষ বিদায়
রোববার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রংপুর নগরীর দখিগঞ্জ মহাশ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। একই সঙ্গে পাশাপাশি চারটি চিতায় তোলা হয় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ছেলে আয়ুশের মরদেহ। স্বজনের কান্নায় সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
গণপতি চক্রবর্তীর দুই বড় ভাই গোপাল চক্রবর্তী ও গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, আমাদের ছোট ভাই গণপতি। সে খুবই সাদামাটা জীবনযাপন করত। কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল না। কিন্তু তাঁকে আজ এমন পরিণতির শিকার হতে হলো! আমরা হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।