সাংবাদিকদের মারধর-হুমকির পর এবার তাদের বিরুদ্ধেই বিএনপি নেতার চাঁদাবাজির অভিযোগ
ফাইল ছবি
শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৩:১৩
শরীয়তপুরে তিন সাংবাদিককে মারধর ও কয়েকজন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের মধ্যে এবার কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লা। বুধবার রাতে তিনি পালং মডেল থানায় এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেন।
অন্যদিকে, মারধরের শিকার সাংবাদিকদের পক্ষ থেকেও থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, অভিযোগ দেওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হলেও সেটি মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়নি। তবে পুলিশ বলছে, দুটি অভিযোগই যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, গত রোববার সময় টিভির সাংবাদিক বিএম ইসরাফিল বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। পরদিন ওই মামলার আসামি পলাশ সরদার ইসরাফিলের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। দুটি মামলাই তদন্তাধীন। তিন সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় সাংবাদিক বরকত মোল্লা একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পরে আরিফুজ্জামান মোল্লাও কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। দুটি অভিযোগই যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী মামলা করা হবে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ
গত শনিবার রাতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীরের তিনটি অংশ ভেঙে দেওয়া হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে সময় টিভির সাংবাদিক বিএম ইসরাফিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। পরদিন সকালে তিনি হামলার শিকার হন। হামলায় তার ডান হাতের কবজি ভেঙে যায় বলে তিনি জানান।
হামলার প্রতিবাদ এবং প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেওয়ার ঘটনার বিচার দাবিতে রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা। এ সময় জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম সেখানে দিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা তাকে ঘিরে ধরে বিক্ষোভ করেন এবং তার প্রত্যাহারের দাবি জানান।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, ওই কর্মসূচির পর বিএনপির একটি অংশ তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসক্লাব ও কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ‘শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়। এতে বিএনপির জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন বলে সাংবাদিকেরা জানান।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই কর্মসূচিতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যান ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাহিদ হাসান, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও জাগো নিউজের প্রতিনিধি বিধান মজুমদার এবং দৈনিক এদিন ও মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি বরকত মোল্লা। সাংবাদিকদের অভিযোগ, সেখানেই জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে কয়েকজন তাদের মারধর করেন।
পরে ওই দিন বিকেলে আরিফুজ্জামান মোল্লা কয়েকজন সাংবাদিককে মুঠোফোনে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন সাংবাদিকেরা। এর পরদিন রাতে কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
জাজিরা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সোনালী নিউজের শরীয়তপুর প্রতিনিধি পলাশ খান বলেন, তার কাছে মুঠোফোনে দেওয়া হুমকির একটি অডিও রেকর্ড রয়েছে। সেখানে আরিফুজ্জামান মোল্লাকে সাংবাদিকদের মারধরের হুমকি দিতে এবং কয়েকজনকে ‘তালিকায়’ রাখার কথা বলতে শোনা যায় বলে তিনি দাবি করেন।
পাল্টা অভিযোগ বিএনপি নেতার
আরিফুজ্জামান মোল্লা সাংবাদিকদের মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দুটি পক্ষ প্রতিবাদ মিছিল করছিল। মিছিলের শেষ দিকে কেউ একজন তাকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করলে কিছুটা হট্টগোল ও হাতাহাতি হয়। পরে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে যায়। বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি।
এর আগে তিনি কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন। তবে অভিযোগে কার বিরুদ্ধে কী ধরনের চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
বিএনপির জেলা সহসভাপতি সিরাজুল হক মোল্লা বলেন, ‘ফ্যাসিস্টদের কিছু দোসর সাংবাদিকতার আড়ালে মব সৃষ্টি করে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন। রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে এমন আচরণের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিএনপিও প্রতিবাদ করেছে।’
তবে বিএনপির কোনো নেতা সাংবাদিকদের মারধর করেছেন- এমন তথ্য তাদের কাছে নেই বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘একজন নেতা রাগের মাথায় একজন সাংবাদিককে কিছু উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। এ ঘটনার তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নিরাপত্তাহীনতায় সাংবাদিকেরা
মারধরের শিকার সাংবাদিক বরকত মোল্লা বুধবার সন্ধ্যায় পালং মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে আরিফুজ্জামান মোল্লা, শরীয়তপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান ওরফে আমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও দুজন সাংবাদিক জিডি করার জন্য থানায় লিখিত আবেদন করেছেন।
বরকত মোল্লা বলেন, ‘পুলিশ কোনো সহযোগিতা করছে না। অন্যদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা আমাকে এবং অন্য সাংবাদিকদের ভয় দেখাচ্ছেন।’
শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল ২৪-এর স্টাফ রিপোর্টার নুরুল আমিন বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকি এবং প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেওয়ার ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক হামলা, হুমকি বা হয়রানির শিকার হতে পারেন না। হামলার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও মামলা না হওয়ায় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে এখন টিভির শরীয়তপুর প্রতিনিধি কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়া প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথমে সাংবাদিকদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের বিরোধ তৈরি হয়। পরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং তাদের বিরুদ্ধে বিএনপির একটি অংশের বিক্ষোভের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তার দাবি, হামলা ও হুমকির কারণে শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
- বিষয় :
- শরীয়তপুর
- সাংবাদিক
- বিএনপি নেতা