সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর ৭ জনের মরদেহে আত্রাইয়ে শোকের মাতম
ছবি- সমকাল
নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:২২
সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর সাত প্রবাসীর মরদেহ দেশে আসার পর শুক্রবার তাঁদের একসঙ্গে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে তাঁরা নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আত্রাইয়ের একাধিক গ্রামের পরিবেশ।
গত রোববার সকাল ১০টার দিকে রিয়াদ থেকে ভিডিও কলে আট মাসের ছেলে তাসরিফকে দেখছিলেন সোহেল রানা সুমন (৩০)। মোবাইলের পর্দায় বাবাকে দেখে হয়তো হাসছিল ছোট্ট তাসরিফ। কে জানত, কয়েক ঘণ্টা পর সেই ভিডিও কলই হবে বাবা-ছেলের শেষ দেখা। ওই দিনই রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান সোহেল।
শুক্রবার তাঁর নিথর মরদেহ পৌঁছেছে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের বাড়িতে। মরদেহের অপেক্ষায় থাকা স্বজনরা পেয়েছেন প্রিয় মানুষটির নিথর দেহ। আট মাসের শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন স্ত্রী আমেনা (২৩)। স্বামীকে হারানোর শোক সামলানোর আগেই তাঁকে ভাবতে হচ্ছে সন্তানকে কীভাবে মানুষ করবেন, কীভাবে চলবে সংসার। সোহেলের বাড়ির মতো একই চিত্র এখন আত্রাই উপজেলার আরও ছয়টি পরিবারে।
একসঙ্গে সাতজনের জানাজা
শুক্রবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে আত্রাই উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল কলেজ মাঠে নিহত সাতজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম রেজু, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান, আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলমসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও বিপুলসংখ্যক স্থানীয় মানুষ অংশ নেন।
জানাজা শেষে একে একে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহনে মরদেহ নিয়ে স্বজনরা ছুটে যান নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির দিকে।
প্রিয় মানুষটির মরদেহ ফিরে পেলেও স্বজনদের মধ্যে ছিল না কোনো স্বস্তি। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন মরদেহের দিকে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হলেও শেষ দেখাটা যে এমন হবে, তা মেনে নিতে পারছিলেন না কেউ।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে সৌদি আরবের অগ্নিকাণ্ডে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে। এর মধ্যে সাতজনের বাড়িই নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রশাসনের সহায়তায় রাত দেড়টার দিকে মরদেহগুলো আত্রাইয়ে পৌঁছায়।
সোহেলের সংসারে এখন শুধু তাসরিফ
আত্রাইয়ের ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা সুমন। প্রায় ১০ বছর সৌদি আরবে থাকার পর দেড় বছর আগে দেশে ফিরেছিলেন তিনি। দেশে এসে আমেনাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর জীবিকার তাগিদে আবার সৌদি আরবে ফিরে যান। এরই মধ্যে তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় ছেলে তাসরিফ।
দূর সৌদি আরবে থেকেও ছেলেকে ভুলতেন না সোহেল। সুযোগ পেলেই ভিডিও কলে ছেলেকে দেখতেন। রোববার সকালেও ছেলের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছেন। মোবাইলের পর্দায় বাবাকে দেখে তাসরিফের হাসিই হয়তো ছিল তাঁদের শেষ স্মৃতি।
কয়েক ঘণ্টা পরই রিয়াদের কারখানায় আগুনের খবর আসে। এরপর থেকেই সোহেলের পরিবারের অপেক্ষা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার অবসান হলো মরদেহ ফিরে আসার মধ্য দিয়ে।
সোহেলের জীবনের গল্পটিও ছিল সংগ্রামের। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে পরিবারের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু দেড় বছর আগে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর বাবা বাদল। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সোহেলই ছিলেন পরিবারের প্রধান ভরসা। বাবার মৃত্যুর পর মা ও পরিবারের দায়িত্ব আরও বেশি করে তাঁর কাঁধে এসে পড়ে।
বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বল ছিল মাত্র দেড় বিঘা জমি। মায়ের কাছে ছিল সামান্য কিছু স্বর্ণালংকার। স্ত্রী ও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেই জমি ও অলংকার বিক্রি করেই আবার সৌদি আরবে পাড়ি জমান সোহেল।
স্বজনদের ভাষ্য, সোহেলের স্বপ্ন ছিল প্রবাসে কাজ করে টাকা জমাবেন। দেশে ফিরে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে একটু স্বস্তির সংসার করবেন। সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করবেন। কিন্তু রিয়াদের একটি কারখানার আগুনে থেমে গেছে সেই স্বপ্ন।
সোহেলের পরিবারে এখন কোনো পুরুষ সদস্য নেই। বাবা নেই, স্বামী নেই। পরিবারের শেষ ভরসা হয়ে আছে আট মাসের শিশু তাসরিফ। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানকে নিয়ে কীভাবে জীবন কাটাবেন, এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমেনার সামনে।
রিয়াদের আগুনে ১৬ প্রাণ
রোববার (৯ আগস্ট) বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুনে ঘটনাস্থলেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁয়। তাঁদের মধ্যে ১২ জন আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের এবং একজন নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা।
অগ্নিকাণ্ডের পর পরিচয় শনাক্ত করতে সময় লাগে। পরে সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়া মরদেহগুলো ধাপে ধাপে দেশে পাঠানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে আত্রাইয়ের সাতজনের মরদেহ দেশে এসেছে।
সৌদি দূতাবাস থেকে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী, নিহত নওগাঁর সাতজন হলেন—আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী এবং বজলুর রহমানের ছেলে কলিমুদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা সুমন এবং পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার।
- বিষয় :
- সৌদি আরব
- অগ্নিকাণ্ড
- নিহত