দেড় লাখ দিয়াশলাই কাঠিতে সাজছে দুর্গাপ্রতিমা, দেখতে ভিড়
ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মন্দিরে চলছে ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা তৈরির কাজ।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ২০:১০
মাটি, খড় ও বাঁশের চেনা কাঠামোর বাইরে এবার দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে তৈরি হচ্ছে দুর্গাপ্রতিমা। এর সঙ্গে থাকছে ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতার সূক্ষ্ম কারুকাজ। সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মন্দিরে চলছে ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা তৈরির কাজ।
পূজা শুরু হতে এখনো মাস খানেক বাকি। তবে এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রতিমাটি দেখতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। নির্মাণকাজের বিভিন্ন ধাপ মুঠোফোনে ধারণ করছেন অনেকে। আয়োজকদের আশা, পূজার পাঁচ দিন সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এই প্রতিমা দেখতে আসবেন।
সরেজমিনে মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। মাটির তৈরি অবয়বের ওপর একটির পর একটি দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা বসিয়ে তৈরি করা হচ্ছে অলংকারের নকশা ও পোশাকের কারুকাজ। সামান্য ভুলে একটি নকশা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি কাঠি ও সুতার অবস্থান ঠিক রাখতে বাড়তি সতর্কতা ও ধৈর্য নিয়ে কাজ করছেন শিল্পীরা।
মৃৎশিল্পী নবদ্বীপ সরকার বলেন, ২০২৩ সালে ভারতে গিয়ে তারা এ ধরনের কাজ দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষীরায় দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পূজার প্রায় এক সপ্তাহ আগে কাজ শেষ করার আশা করছেন তিনি।
ব্রহ্মরাজপুর পূজা উদ্যাপন কমিটির ক্যাশিয়ার অমিত ঘোষ বলেন, গত বছর ধানের প্রতিমাসহ পূজায় ব্যয় হয়েছিল প্রায় তিন লাখ টাকা। এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা ব্যবহারের কারণে খরচ বেড়েছে। প্রতিমা তৈরিতে দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি এবং ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা ব্যবহার করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে এবার পূজায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে।
দাহ্য উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি মাথায় রেখে ঝুঁকি কমাতে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানান অমিত ঘোষ।
মন্দির কমিটির উপদেষ্টা কানাইলাল বলেন, ব্রহ্মরাজপুরে প্রতিবছরই ব্যতিক্রমী কিছু করার চেষ্টা থাকে। গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল। সেই প্রতিমা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসেছিলেন। দর্শনার্থীদের ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় এবার আরও আকর্ষণীয় কিছু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেই ভাবনা থেকেই দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ।
ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রতিমার দাহ্যতার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহারের পাশাপাশি ভাস্কর ও কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এর পরীক্ষা করা হয়েছে।
দর্শনার্থী কৌশলী সরকার বলেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আমরা চাই সবাই এখানে আসুক, প্রতিমা দেখুক এবং আনন্দ করুক।’ তার মতে, প্রতিবছরই এই মন্দিরে নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকে। গত বছর ধানের প্রতিমা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করেছিল। এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমা আরও বেশি আকর্ষণ তৈরি করবে বলে তার আশা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ব্রহ্মরাজপুরে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। এবারও পূজা কমিটি, গ্রামবাসী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরাপদ পরিবেশে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
মৃৎশিল্পী নবদ্বীপ সরকারের জন্যও এবারের কাজটি বিশেষ। ২০২৬ সালে তিনি চারটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এর মধ্যে ব্রহ্মরাজপুরের প্রতিমাটিই সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বলে জানান তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, ২০২৫ সালে জেলায় ৫৮৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারও কাছাকাছি সংখ্যক বা এর চেয়ে বেশি পূজা হতে পারে। গত বছর ব্রহ্মরাজপুরের ধানের প্রতিমা দেখতে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী এসেছিলেন। এবার দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমা তৈরির কাজ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠছে। এবারও জেলার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসবেন বলে আশা করছেন তিনি।
- বিষয় :
- সাতক্ষীরা
- দুর্গাপূজা
- প্রতিমা