উৎপাদন ৩৩ হাজার টন গম এরপরও গুদাম শূন্য
লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাতে সময় বাকি আর মাত্র এক দিন, কিন্তু খাদ্য গুদামের বিশাল এলাকা খাঁ খাঁ করছে। লালপুর উপজেলা সরকারি খাদ্য গুদামে আগামীকাল ৩১ আগস্ট শেষ হতে যাচ্ছে চলতি মৌসুমের সরকারি গম সংগ্রহ অভিযান। এখন পর্যন্ত এক ছটাক গমও সংগ্রহ করতে পারেনি খাদ্য বিভাগ। গত বছরের চেয়ে কেজিতে ২ টাকা বাড়িয়ে এবার ৩৬ টাকা (মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা) দর নির্ধারণ করা হলেও জটিল নিয়মনীতি ও বাজারদরের তারতম্যের কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন চাষিরা।
গম সংগ্রহের এ চিত্র সাময়িক নয়; এর আগে ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও গুদামে এক কেজি গমও জমা পড়েনি। ফলে টানা চার বছর ধরে লালপুরে সরকারি গম সংগ্রহের ঝুলি শূন্যতেই আটকে রইল।
উপজেলা খাদ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে গত ৩ মে থেকে ১ হাজার ৪১৩ টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কেনাবেচা শুরু হয়। তবে উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। এ বছর উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার কৃষক ৮ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে গমের সফল চাষাবাদ করেছেন, যেখানে উৎপাদন হয়েছে ৩৩ হাজার ২৯৯ টন। বিপুল এ উৎপাদনের বিপরীতে সরকারি গুদামে এক ছটাক গম না আসা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। অথচ গমের ক্ষেত্রে ভরাডুবি হলেও বোরো ধান (১৬৭ টন) ও চাল (৬৯৫ টন) সংগ্রহের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ২৩ আগস্টের মধ্যেই শতভাগ অর্জিত হয়েছে।
কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুদামে গম না আসার পেছনে প্রধান কারণ বাজারদর এবং সরকারি শর্তের কঠোরতা। বর্তমানে উন্মুক্ত বাজারে প্রতি মণ গম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়, যা সরকারি দরের চেয়ে মণপ্রতি অন্তত ৫০ টাকা বেশি। তাছাড়া গুদামে বিক্রি করতে গেলে আর্দ্রতার মাত্রা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশের মধ্যে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকে। অপরদিকে বাজারে ১৮ শতাংশ আর্দ্রতা থাকলেও ব্যবসায়ীরা অনায়াসে গম কিনে নিচ্ছেন।
চাষিদের অভিযোগ, গুদামে গম নিয়ে গেলে কুলি খরচ, গাড়ি ভাড়া ও পরিমাপের ঝামেলার পেছনে মণপ্রতি আরও বাড়তি ৫০ টাকা খরচ হয়ে যায়। ফলে লোকসান এবং হয়রানি এড়াতে সাধারণ কৃষকরা খোলা বাজারেই শস্য বিক্রি করে দিচ্ছেন।
মাজদার আলী নামে এক স্থানীয় গমচাষি আক্ষেপ করে বলেন, বাজারে কোনো ঝামেলা ছাড়াই চড়া দামে ক্যাশ টাকায় বিক্রি করা যায়। গুদামে যদি বাজারের চেয়ে মণপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়তি দাম দেওয়া হতো, তবে কৃষকরা অবশ্যই সরকারি গোডাউনে আসতেন। আড়বাব ইউনিয়নের চণ্ডীগাছা বাজারের গম ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম জানান, এক মাস আগেও যখন বাজারে গমের দাম মণপ্রতি ১ হাজার ৪০০ টাকা ছিল, খাদ্য বিভাগ চাইলে তখনই উদ্যোগ নিয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারত।
উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক সাকের হোসেন বলেন, দর নির্ধারণের পরপরই বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা আর যোগাযোগ করেননি। তবে অনলাইনে অ্যাপের মাধ্যমে সফলভাবে ৯৮ জন নিবন্ধিত কৃষকের মধ্যে ৫৬ জনের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় জানান, উৎপাদন সন্তোষজনক হলেও কৃষকরা যেখানে লাভ বেশি পাবেন সেখানেই বিক্রি করবেন। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আফরোজা পারভীন বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত ৩৬ টাকা কেজি দরে বাজারে এখন গম মিলছে না। তবুও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
লালপুর উপজেলা গম, ধান ও চাল সংগ্রহ কমিটির সভাপতি এবং ভারপ্রাপ্ত ইউএনও আবির হোসেন জানান, টানা চার বছর ধরে লালপুরে গম সংগ্রহের এ ব্যর্থতা ও বাজারের বাস্তব চিত্র উল্লেখ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হবে, যেন আগামীতে বাস্তবসম্মত দর নির্ধারণ করা হয়।
- বিষয় :
- গম