ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খুলনায় খুনোখুনি বন্ধে এক মাসের সময়সীমা

খুলনায় খুনোখুনি বন্ধে এক মাসের সময়সীমা
×

ছবি: সমকাল ইপেপার

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনাসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে খুলনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে খুনখারাবিতে জড়াচ্ছে একাধিক পক্ষ। সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি করতে এক মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনার, ডিআইজি ও পুলিশ সুপারকে (এসপি) এ সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। 

গতকাল শনিবার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় খুলনা অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়েছে। এ সময় সারাদেশে পুলিশকে আরও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। 

সভায় খুলনার পুলিশ কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান, ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান ও পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুকের কাছে নিজ এলাকার বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণ ও প্রতিকারে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে– জানতে চাওয়া হয়। খুলনার কমিশনার ও ডিআইজির ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি নীতিনির্ধারকরা। এর পর ৩০ দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত ও দৃশ্যমান উন্নতি সাধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়। গতকাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। 

রাজারবাগে অনুষ্ঠিত সভায় এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসের অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। সভায় অতিরিক্ত আইজি, সব মহানগর পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং পুলিশ সুপাররা উপস্থিত ছিলেন। পর্যালোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির। 

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, সভায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় এপ্রিল থেকে জুন মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়েছে। এ ধরনের ঘটনায় করা মামলার যথাযথ তদন্ত ও অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি একজন চিকিৎসককে টার্গেট করে হামলার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বার্তা দেওয়া হয়েছে।  

পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় জুন মাসে দুই হাজার ২০০টি, মে মাসে এক হাজার ৯৫২টি এবং এপ্রিলে দুই হাজার ১১টি মামলা হয়েছে। এ তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট মামলা ছয় হাজার ১৬৩টি। এ ছাড়া গত জানুয়ারিতে একই ধরনের অপরাধে মামলা এক হাজার ২৮১টি, ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ১৮১ ও মার্চে এক হাজার ৪৮৫টি। বছরের এই তিন মাসে মোট মামলা তিন হাজার ৯৪৭টি। বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় দ্বিতীয় তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে দুই হাজার ২৬১টি। 

একাধিক সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান আরও উন্নতি চেয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। এ লক্ষ্যে পুলিশকে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে। সভায় বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করছে না। তাহলে কেন জনপ্রত্যাশামাফিক কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হবে না? পুলিশের জনবল বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেটি বাস্তবায়নে কাজও শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। 

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সম্প্রতি মাদকবিরোধী সমাবেশ ও শোভাযাত্রা উপলক্ষে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী ব্রাহ্মণবাড়িয়া যান। এ উপলক্ষে রাতে পুলিশ লাইন্সে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জেলা পুলিশ। অনুষ্ঠান চলাকালে উচ্চ স্বরে গানবাজনার অভিযোগে মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে তা থামানোর কথা বলেন। এ নিয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাদের তর্ক হয়। পরে তারা পুলিশ লাইন্সে ঢুকে অনুষ্ঠানস্থলের চেয়ার ভাঙচুর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা করে। 

সেদিনের পরিস্থিতি তুলে ধরে অপরাধ পর্যালোচনা সভায় বলা হয়েছে, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা কোনো এলাকা পরিদর্শনে গেলে পুলিশ লাইন্সের ভেতরে এ ধরনের অনুষ্ঠান ‘ব্রিটিশ আমলের সংস্কৃতি’। ডিআইজি কোনো জেলায় গেলে এসপির বাসায় ‘ডিনার’ করতে পারেন। প্রটোকলভিত্তিক এ ধরনের অনুষ্ঠান কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। সভায় বলা হয়, রাত সাড়ে ৯টার দিকে ডিআইজি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ত্যাগ করেন। এরপর অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনা ঘটে।  

সংশ্লিষ্ট অন্য একটি সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংকট ঘিরে যাতে কোনো মহল অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ঘটাতে না পারে, সে ব্যাপারে মাঠ প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অপপ্রচার ও গুজবের ব্যাপারে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যে কোনো তৎপরতার গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়কে পুঁজি করে আড়াল থেকে কেউ যাতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। 

সভায় একজন পুলিশ সুপার বাহিনীর সদস্যদের পদোন্নতির বিষয় তুলে ধরেন। সেখানে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতির কথা জানানো হয়েছে। ২০ বছরের বেশি চাকরির বয়স পার হলেও অনেকে এসপি রয়ে গেছেন। তবে অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা কয়েকটি ধাপে পদোন্নতি পেয়েছেন। সুপারনিউমারারি পদোন্নতি যারা পেয়েছেন তাদের নিয়মিত পদোন্নতির বিষয়টি উঠে আসে।

এ ছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে আরও জোরালো ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র একটি ইউনিট গঠনের বিষয়টি উঠে আসে। উগ্রবাদ যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে। পুলিশের যানবাহন সমস্যা নিরসনের বিষয়েও আলোচনা হয়।  

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, খুব দ্রুত খুলনা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মাঠ পর্যায় থেকে আরও শক্ত পদক্ষেপ দেখতে চায় সরকার। সভায় খুলনার ডিআইজি, মহানগর পুলিশ কমিশনার ও এসপির কাছে বর্তমানে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ব্যাপারে জানতে চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ডিআইজি বলেছেন, তিনি বিভিন্ন জেলা ও ইউনিট পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন। জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া খুলনা অঞ্চলের পুলিশের আরও এক শীর্ষ কর্মকর্তা অপরাধীদের তালিকা ও টহল বাড়ানোর বিষয় উল্লেখ করেন।  

সমকালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত খুলনা মহানগর এলাকায় ৯৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত খুনের ঘটনা ২৯টি।

পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, জুলাই মাসে চট্টগ্রাম মহানগরে খুনের ৪টি, খুলনায় ৩টি, রাজশাহীতে ১টি, সিলেটে ৫টি, গাজীপুরে ৭টি মামলা হয়। জুলাই মাসে ঢাকা রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ৬৬টি খুন হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খুন চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৫৪টি। খুলনা রেঞ্জে ২৯টি। মে থেকে জুলাই মাসে খুলনা রেঞ্জে খুন ৮৫টি। এ ছাড়া খুলনা মহানগরে তিন মাসে খুনের ঘটনা ৯টি। 

পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, পুলিশ মহাপরিদর্শক জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধ দমনের জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। আইজিপি বলেন, সব ধরনের অপপ্রচার ও গুজব সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটার আগেই সে সম্পর্কে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, পুলিশ দেশের জন্য, জনগণের কল্যাণে কাজ করছে। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। 

সভায় গত তিন মাসের ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, পুলিশ আক্রান্ত ও অপহরণ মামলা, মুলতবি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্ত ও বিচারের ফলাফল, সাজার হার ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ডাকাতি মামলা, ধর্ষণ মামলার তদন্ত বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পুলিশ আক্রান্ত মামলার তদারকি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। মুলতবি মামলা কমিয়ে সাজার হার বাড়ানোর ওপরেও জোর দেওয়া হয়। এ ছাড়া নিখোঁজের ঘটনায় করা জিডি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। 

আরও পড়ুন

×