এক্সেলসিয়র সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট
পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধে প্রবাসী উদ্যোগে হোঁচট
এক্সেলসিয়র সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের একটি অংশ। গতকাল রোববার তোলা। ছবি: সমকাল
মুকিত রহমানী, সিলেট
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৩০
‘এক যুগের বেশি সময় আগে সিলেটের জাকারিয়া সিটিতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়ার পর আমরা এগিয়ে আসি। যারা শুরুতে প্রস্তাব করেন, তারা শতাধিক ব্যক্তির কাছে শেয়ার বিক্রি করেন। আমরা চাইছিলাম সিলেটের সুন্দর একটি জায়গায় বিনিয়োগ করলে প্রবাসীদের জন্য দৃষ্টান্ত হবে। লাভের আশা করিনি। কিন্তু পদে পদে বাধা ও প্রতারণার কারণে আজ প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। ১৩-১৪ বছরে বিনিয়োগের এক টাকাও কোনো পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার পাননি। দু-একজন পরিচালক দায়িত্ব পেয়ে আখের গুছিয়েছেন।’ দুঃখ ও ক্ষোভ থেকে এসব কথা বলছিলেন এক্সেলসিয়র সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. জিলু মিয়া।
যুক্তরাজ্য থেকে তিনি টেলিফোনে সমকালকে আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়ালে শুধু দর্শনার্থী কিংবা বিনোদনপ্রেমীদের সমাগমই হবে না, সেখানে কর্মসংস্থানও বাড়বে।
সিলেট শহরতলির খাদিমপাড়া এলাকায় ২০০৪ সালে ১৭ একর টিলা রকম ভূমির ওপর ‘জাকারিয়া সিটি’ নাম দিয়ে বিনোদন কেন্দ্র ও রিসোর্ট স্থাপন করেছিলেন সিলেটের শিশু চিকিৎসক জাকারিয়া আহমদ। বেশ কয়েক বছর পরিচালনার পর তিনি ২০১২ সালের দিকে এটি প্রবাসীদের কাছে বিক্রি করে দেন। ১৩০ জন প্রবাসী এখানে বিনিয়োগ করেন। নাম দেওয়া হয় এক্সেলসিয়র সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট। ওই সময় চেয়ারম্যান ছিলেন প্রবাসী ও সিলেট সদর বিএনপি নেতা শাহজামাল নুরুল হুদা। পরে বিনিয়োগকারীরা দুটি পক্ষে বিভক্ত হলে আদালতে মামলাও করা হয়। সর্বশেষ উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৯ জন পরিচালকদের মধ্যে ১০ জনকে দিয়ে পরিচালনা বোর্ড করা হয়।
জানা গেছে, মামলা ও দ্বন্দ্বের মধ্যে সরকার পরিবর্তন হলে দখল পাল্টা-দখলেরও ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ পরিচালনা বোর্ডের সদস্যরা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি কিংবা কাউকে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেন। চিঠি লেনদেনের পর ২০২৫ সালে এক্সেলসিয়রের দায়িত্ব দেওয়া হয় নগর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রাহাত চৌধুরী মুন্নাকে। কোম্পানির চেয়ারম্যান জিলু মিয়া পরিচালকদের সম্মতি নিয়ে মুন্নাকে দায়িত্ব দেন। তিনি ব্যাংক দায় ছাড়াও পরিচালকদের বিনিয়োগের ৫০ ভাগ অর্থ ফেরত দিতে চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু কিছু দিন পরই ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুকুর রহমান বেঁকে বসেন। তিনি দায়িত্ব দেন স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলামকে। পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে ২ আগস্ট রাতে রিসোর্টের হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে শহিদুলের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে তিনি জানান, রিসোর্টটি জবরদখলের চেষ্টা চলছে। তাকে ১৯ জন পরিচালকের মধ্যে ১৪ জন দায়িত্ব দিয়েছেন। বিষয়টি পুলিশ প্রশাসন দেখছে।
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, প্রায় ১৩০ জন প্রবাসী সেখানে বিনিয়োগ করেছেন। প্রবাসীরা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যাংক লোন নেন। দুটি কিস্তি দেওয়ার পর আর কোনো কিস্তি না দেওয়ায় ব্যাংক লোন দাঁড়িয়েছে ৮৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ভ্যাট না দেওয়ায় ২৭ লাখ টাকা বকেয়ার অভিযোগে মামলা করে সিলেট ভ্যাট অফিস। গত ৮-১০ বছর মামলা চলার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০২৩ সালে ১৯ জন পরিচালকের মধ্যে ১০ জনকে পরিচালক হিসেবে দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাতে চেয়ারম্যান করা হয় জিলু মিয়াকে ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয় মাসুকুর রহমানকে। ১০ জন পরিচালকের মধ্যে বর্তমানে দুজন মারা গেছেন। আটজনের পক্ষে রাহাত চৌধুরী মুন্না দায়িত্ব পেয়ে রিসোর্টটি পরিচালনা করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। অন্য দিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুকুর রহমান দায়িত্ব দেন ওই এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলামকে। এতে দেখা দেয় বিপত্তি। বর্তমানে থানা পুলিশ উভয় পক্ষের কাগজপত্র জমা নিয়েছে।
এ বিষয়ে শাহপরাণ থানার ওসি ফেরদৌস আহমদ সমকালকে জানান, আদালত যে ১০ জনকে পরিচালক করে দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে একটা সিদ্ধান্ত দেবেন তিনি। সোমবার রাতে এ নিয়ে বসার কথা রয়েছে।
বর্তমানে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা রাহাত চৌধুরী মুন্না বলেন, ‘১০ জন পরিচালকের পক্ষে স্ট্যাম্পে লিখিতভাবে পরিচালনার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়। ব্যাংকের দেনা ২৩ কোটি টাকা থেকে ৮৫ কোটির কাছাকাছি। ৪০ লাখের ওপর ভ্যাট। আমি তা পরিশোধের উদ্যোগও নিয়েছি। তাদের কাছে সময় চেয়েছি। এর মধ্যে একটি পক্ষ ভুয়া পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে দাবি করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।’
- বিষয় :
- সিলেট