জিও ব্যাগ কেটে বালু চুরি, সেই ব্যাগেই ভরে ফের বিক্রি
চারঘাটের পিরোজপুর এলাকায় নতুন জিও ব্যাগের সঙ্গে পুরোনো মিলিয়ে ফেলা হচ্ছে নদীতে। ছবি: সমকাল
চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৩৭
পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে নদীতে ফেলা হচ্ছে হাজার হাজার জিও ব্যাগ। কিন্তু ভাঙন ঠেকানোর সেই ব্যাগই আবার নদী থেকে কেটে তুলে নেওয়া হচ্ছে। বস্তার ভেতরের বালু নদীতে ফেলে খালি ব্যাগ বিক্রি করা হচ্ছে ঠিকাদারের লোকজনের কাছে। পরে সেই ব্যাগেই আবার বালু ভরে ফেলা হচ্ছে নদীতে। শুধু তা-ই নয়; নির্ধারিত মানের বদলে মাটিযুক্ত বালু ব্যবহার এবং প্রতিটি ব্যাগে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম বালু দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে এরই মধ্যে ৩৫০টি পুরোনো জিও ব্যাগ জব্দ করেছে চারঘাট উপজেলা প্রশাসন। গত ২৬ জুলাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মীর মেজবাহীজ্জুলাম চৌধুরী এ অভিযান চালান। পরদিন ২৭ জুলাই বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে লিখিতভাবে জানানো হয়।
ভাঙন ঠেকাতে কোটি টাকার প্রকল্প
বর্ষা শুরুর আগ থেকেই চারঘাট উপজেলার গোপালপুর, চন্দনশহর, পিরোজপুর ও সাহাপুর এলাকায় পদ্মার তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রথমে সাহাপুর ও পিরোজপুর এলাকায় বিশেষ তহবিল থেকে প্রায় ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯ হাজার ২০০টি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়। পরে প্রকল্পের আওতা বাড়ানো হয়। শুধু পিরোজপুরে ১০টি প্যাকেজে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৫ হাজার এবং সাহাপুরে তিনটি প্যাকেজে ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩ হাজার ৫০০টি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। সব মিলিয়ে এসব কাজে ব্যয় হচ্ছে ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
এক ব্যাগেই ‘দুই দফা’ খরচ
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি নতুন জিও ব্যাগের দাম ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা। নদীতে ফেলার পর অসাধু একটি চক্র ছুরি দিয়ে ব্যাগ কেটে ভেতরের বালু পানিতে ফেলে দেয়। পরে খালি ব্যাগ ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় ঠিকাদারের লোকজনের কাছে বিক্রি করা হয়। সেই ব্যাগেই আবার বালু ভরে নদীতে ফেলা হয়।
এভাবে একটি ব্যাগ পুনর্ব্যবহার করলে ঠিকাদারের ব্যাগপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা সাশ্রয় হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অন্যদিকে নদী থেকে ব্যাগ তুলে বিক্রি করে অর্থ আয় করছে একটি চক্র। কেউ কেউ এসব ব্যাগ বাড়ির আঙিনা, গোয়ালঘর কিংবা শৌচাগারের বেড়া তৈরির কাজে ব্যবহার করছে।
পিরোজপুর এলাকার সান্টু আলী বলেন, ‘নতুন বস্তা নদীতে ফেলার আগে গণনা করার সময় সবুজ রঙের চিহ্ন দেওয়া হয়। কিন্তু নদীতে আগের রঙের চিহ্নযুক্ত পুরোনো বস্তাও ফেলা হচ্ছে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখি, কিছু লোক নদী থেকে বস্তা কেটে তুলে ঠিকাদারের লোকজনের কাছে বিক্রি করছে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, নতুন জিও ব্যাগের পাশাপাশি আগের ব্যবহার করা ব্যাগেও বালু ভরে নদীতে ফেলা হচ্ছে। প্রতিটি ব্যাগে ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি বালু থাকার কথা থাকলেও তার চেয়ে কম বালু রয়েছে। এ ছাড়া মোটা বালুর পরিবর্তে চরের মাটিযুক্ত বালু ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
রেন্টু আলী নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘নদী থেকে কেউ কেউ দিনে ১৫ থেকে ২০টি জিও ব্যাগ বিক্রি করে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছে। অনেকে জিও ব্যাগ তুলে বাড়ির বিভিন্ন কাজেও ব্যবহার করছে।’
অরক্ষিত আরও পাঁচ কিলোমিটার
স্থানীয়দের ভাষ্য, চারঘাটে প্রায় আট কিলোমিটার নদীতীরে স্থায়ী ব্লক বাঁধ থাকলেও আরও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা এখনও অরক্ষিত। প্রতিবছর বর্ষা এলে জরুরি প্রকল্পের মাধ্যমে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চারঘাট উপজেলা সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘ভাঙন প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না নিয়ে প্রতিবছর জরুরি প্রকল্পের নামে জিও ব্যাগ ফেলে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নদীপাড়ের বাসিন্দারা প্রতিদিন অভিযোগ নিয়ে আসছেন।’
তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খাজা তারেক এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত কারিগরি মান অনুসরণ করেই কাজ করা হচ্ছে। আমরা পুরোনো জিও ব্যাগ ব্যবহার করিনি।’
পাউবোর রাজশাহী প.ও.র. বিভাগের চারঘাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবু রৌশন মাস্উদ বলেন, ‘জিও ব্যাগ ফেলা একটি অস্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। সংসদ সদস্য ও স্থানীয়দের অনুরোধে কাজটি জরুরি ভিত্তিতে করা হচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি ব্যাগ কেটে বিক্রির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
ইউএনও জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘৩৫০টি পুরোনো জিও ব্যাগ জব্দ করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও পাউবোকে জানানো হয়েছে। কাজের মান নিশ্চিত করতে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।’
- বিষয় :
- রাজশাহী