ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টাঙ্গাইল

অযত্ন-অবহেলায় ভাসানী হল, মুখ থুবড়ে পড়েছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড

অযত্ন-অবহেলায় ভাসানী হল, মুখ থুবড়ে পড়েছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
×

টাঙ্গাইলের ভাসানী হল প্রাঙ্গণে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড। ছবি: সমকাল

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৫৯

টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র ছিল ভাসানী হল। নাটক, সংগীত, নৃত্য, কবিতা, বইমেলা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা আয়োজনে মুখর থাকত পুরো প্রাঙ্গণ। অথচ দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলায় মিলনায়তনটি পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত ভবনে।

ভাসানী হল প্রাঙ্গণে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড, বারান্দায় বসে পানের দোকান, সন্ধ্যা নামলে জায়গাটি হয়ে ওঠে মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আড্ডাখানা। নিয়মিত সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক ভবনটি। প্রায় এক যুগ আগে প্রশাসন এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এরপর থেকে বন্ধ হয়ে যায় জেলার অন্যতম বড় এই মিলনায়তনের কার্যক্রম। যে হল এক সময় সংস্কৃতিকর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকত, সেটি এখন ধুলোবালি, ভাঙাচোরা দেয়াল, খসে পড়া পলেস্তারা আর তালাবদ্ধ কক্ষের নিস্তব্ধতায় ঢাকা।

জানা গেছে, টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৩৫ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত ভাসানী হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ১৯৭৬ সালের ১৬ আগস্ট। তৎকালীন রাষ্ট্রপতির শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৭৮ সালের ২ এপ্রিল মিলনায়তনের উদ্বোধন করেন তৎকালীন ঢাকা বিভাগের কমিশনার খানে আলম খান। প্রথমে নাম ছিল টাঙ্গাইল টাউন হল। পরে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নামে ‘ভাসানী হল’ রাখা হয়।

টাঙ্গাইলের সংস্কৃতিকর্মীরা বলেন, এক হাজার আসনের এই মিলনায়তনে জেলার সব সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক অনুষ্ঠান হতো। শুধু তাই নয়, এই মিলনায়তন ঘিরে নাট্যচর্চাসহ সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়মিত আড্ডা বসত। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ভাসানী হল চত্বরে হতো বইমেলা। এখানে ঈদের সময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্টের আয়োজন করত। এ ছাড়া অনেক রাজনৈতিক সভা-সমাবেশও হতো। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মূলকেন্দ্র ছিল হলটি। কিন্তু প্রায় এক যুগ ধরে হলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

সরেজমিন দেখা যায়, প্রতিদিন সকালে হলের বারান্দায় বসে পানের পাইকারি দোকান। পুরো প্রাঙ্গণ ব্যবহার হচ্ছে ট্রাকস্ট্যান্ড হিসেবে। রাতে ছিন্নমূল মানুষ অবস্থান করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর পুরো পরিবেশ বদলে যায়। নিয়মিত মাদকসেবীদের আনাগোনা শুরু হয়। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় ভবনটির নিরাপত্তা ও তদারকি নেই বললেই চলে। এক সময় যে জায়গায় পরিবার নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে আসতেন মানুষ, এখন সন্ধ্যার পর সেখানে যেতেও ভয় পান অনেকে।

বিশিষ্ট সুরকার ও শিল্পী ফিরোজ আহমেদ বাচ্চু জানান, ভাসানী হল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন তিনি। হলটি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য খুব উপকারী ছিল। এখন একটি ভালো অনুষ্ঠান করতে গেলে শিল্পকলা একাডেমিতে যেতে হয়। তবে আগের মতো এতো বড় করে অনুষ্ঠান করা যায় না।

টাঙ্গাইল হ্যারিটেজ কালচারাল ফোরামের সাধারণ সম্পাদক জাকির খানের ভাষ্য, টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম প্রধান জায়গা হচ্ছে ভাসানী হল। প্রায় একযুগ ধরে এটি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে গতিশীল রাখার জন্য ভাসানী হল খুব প্রয়োজন। ভাসানী হল শুধু একটি ভবন নয়; এটি টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও হ্যারিটেজের অংশ। দ্রুত সংস্কার না হলে এ স্থাপনা হারিয়ে যেতে পারে।

টাঙ্গাইল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান খান জানান, সাংস্কৃতিকচর্চার অন্যতম প্রধান জায়গা ভাসানী হল। সমাজে যে মাদকের ছোবল, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, এর থেকে মুক্তি পেতে হলে ক্রীড়া অঙ্গন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে মুখরিত রাখতে হবে। তার জন্য একটি ভালো অডিটরিয়াম প্রয়োজন। 

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ভাসানী হল টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য, শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মওলানা ভাসানীর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাটির ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকায় হলটির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে হলটির অবস্থা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুনর্নির্মাণ করা হবে।

আরও পড়ুন

×