ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘তিন মাস পর বাদায় যাব এই ভাইবে খুশি লাগছে’

নিষেধাজ্ঞা শেষে কাল খুলছে সুন্দরবন

‘তিন মাস পর বাদায় যাব এই ভাইবে খুশি লাগছে’
×

কয়রা (খুলনা) ও শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:০৩

সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ শিকার করে বড় হয়েছেন শফিকুল ইসলাম। তাই বনের সঙ্গে গড়ে উঠেছে নিবিড় সখ্য। তাই তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামীকাল মঙ্গলবার সুন্দরবন খোলার খবরে খুশিতে মন ভরে উঠেছে তাঁর।

সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি শেষ করেছেন শফিকুল। গতকাল রোববার পূর্ব মঠবাড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শাকবাড়িয়া নদীর বাঁধে দেখা গেল তাঁকে। তিনি বলেন, ‘তিন মাস পর বাদায় ঢুকতি পারব-এটা ভাবতিই খুশিতে মন ভইরে উঠিছে।’ তবে খুশির সঙ্গে শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন তিনি। সেই শঙ্কা বনদস্যুর। অনেকদিন এমন শঙ্কা ছিল না। কিন্তু দুই বছর ধরে ফের বনদস্যুর উৎপাত বেড়েছে। তবুও সেই শঙ্কা ও ভয় উপেক্ষা করে সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন শফিকুলের মতো কয়েক হাজার জেলে।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বনবিভাগের দেওয়া তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আজ ৩১ আগস্ট। আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ শিকারে যেতে পারবেন জেলেরা। তাই সুন্দরবন-সংলগ্ন গ্রামগুলোতে এ মুহূর্তে উৎসবের ভাব দেখা গেছে। কেউ মহাজনের দাদন নিয়ে, কেউ সংস্থার ঋণ নিয়ে নৌকা মেরামত করেছেন। সেই সঙ্গে পরিবার ও নিজেদের জন্য বাজার-সওদা সেরে ফেলেছেন। প্রতি আমবস্যা ও পূর্ণিমা গোন শেষে বাড়ি ফিরবেন তারা। এভাবেই চলবে আগামী ৯ মাস।  

বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা রেঞ্জে বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেটধারী (বিএলসি) জেলে রয়েছেন প্রায় তিন হাজার। প্রতিটি বিএলসির বিপরীতে এক সপ্তাহের অনুমতি নিয়ে গড়ে চারজন করে জেলে সুন্দরবনের খালে প্রবেশ করতে পারবেন। সে হিসাবে খুলনা রেঞ্জে প্রায় ১২ হাজার জেলে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে মঙ্গলবার সুন্দরবনে প্রবেশ করবেন। এ ছাড়া পর্যটকবাহী ট্রলারগুলোও চলাচলের অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে যাতায়াত শুরু করবে। 

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, তিন মাস পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও বাওয়ালিদের সুন্দরবনে ঢোকার পাস (অনুমতি) দেওয়া হবে। এ জন্য তাদের কিছু নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। জেলেদের নিরাপত্তা ও বনের সংরক্ষিত এলাকার নিরাপত্তায় টহল জোরদার করা হয়েছে। 

শ্যামনগরেও ব্যস্ততা পর্যটন ব্যবসায়ী ও জেলে-বাউয়ালিদের

সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য মুখিয়ে থাকা জেলে-বাউয়ালিসহ পর্যটন ব্যবসায় জড়িতদের পদচারণায় রীতিমতো মুখর সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকা। জাল-নৌকা, আটন আর দোন-দড়ি মেরামতসহ যাবতীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছেন বনজীবীরা। এখন তাদের অপেক্ষা শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষের। 

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের নীলডুমুর বাজারসহ দাতিনাখালী, হরিনগর ও আশপাশের এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য তারা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। তিন মাস ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা নৌযান থেকে জাল-দোড়া সবই ইতোমধ্যে সারাই করেছেন নিজেদের মতো করে। সুন্দরবন দর্শনে আসা হাজার হাজার পর্যটকের সুবিধার্থে ট্যুরিস্ট স্পটগুলোও প্রস্তুত করা হয়েছে।

বনবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছর সাতক্ষীরা রেঞ্জে মোট বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) রয়েছে ২,৯৩৮টি। যার মধ্যে মাছের ১,১৪৮টি, কাঁকড়ার ১৭০০, গোলপাতার ২, প্রমোদ ট্রলার ৭৪, লবণ পানির একটি এবং মধুর বিএলসি ১২টি। এর বাইরে মাছ-কাঁকড়া শিকারের জন্য আরও অন্তত ৫০০টি ডিঙি নৌকা অনুমতি নিয়েছে বলেও নিশ্চিত করে বনবিভাগ।

সুন্দরবন উন্মুক্ত হতে যাওয়া প্রসঙ্গে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান বলেন, তিন মাস বন্ধ থাকার কারণে সুন্দরবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তিন-চার সপ্তাহ আগে পূর্ব সুন্দরবনের পাশাপাশি পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে মা বাঘসহ দুটি বাচ্চা দেখা গেছে। ইতোমধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জের ইকো ট্যুরিজম সেন্টার হিসেবে খ্যাতি পাওয়া কলাগাছিয়া এবং দোবেকী টহলফাঁড়িকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে।

চারটি স্টেশন থেকে পাস দেওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি আরও জানান, সুন্দরবনে প্রবেশের আগে প্লাস্টিক-পলিথিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা জানিয়ে দেওয়া হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কোনো সংশয় নেই–উল্লেখ করে তিনি বলেন, আশা করা হচ্ছে, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার সাতক্ষীরা রেঞ্জে বিপুলসংখ্যক পর্যটক ভিড় করবে। এ ছাড়া সাতক্ষীরা রেঞ্জে তৎপর বনজীবীরা প্রত্যাশামতো মাছ-কাঁকড়া পাবে।

আরও পড়ুন

×