ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

থামছে না মেঘনার ভাঙন, ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হাজারো পরিবার

থামছে না মেঘনার ভাঙন, ভিটেমাটি  হারিয়ে নিঃস্ব হাজারো পরিবার
×

মেঘনার ঢেউয়ে জমির সঙ্গে ভেঙে পড়ছে গাছ। গত শনিবার নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার হরনী ইউনিয়নের দরবেশবাজার এলাকায় সমকাল

নোয়াখালী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় চীনের দুঃখ ছিল হোয়াংহো নদী, আর আজ নদীবেষ্টিত নোয়াখালীর হাতিয়া ও সুবর্ণচর উপজেলার দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে খরস্রোতা মেঘনা। মেঘনার অবিরত ও ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার বসতবাড়ি ও বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি। গৃহহীন হয়ে পড়ছে দ্বীপাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। তীব্র নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে এখন ঘোর দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন হাতিয়া উপজেলার 
হরনী, চানন্দী, তমরুদ্দি ও নলচিড়া ইউনিয়নের অধিবাসীরা।

ভাঙনকবলিত এলাকার লোকজনের দাবি, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে মেঘনার গ্রাসে চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার কৃষিজমি ও বসতবাড়ি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে সরকারি হিসাব অনুযায়ী কিছুটা কম হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড নোয়াখালী কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ওই সব এলাকায় প্রতিবছর গড়ে কমপক্ষে এক কিলোমিটার করে ভূখণ্ড নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
নদীর এই রাক্ষুসে রূপের কাছে কতটা অসহায় স্থানীয় মানুষ, তার বাস্তব উদাহরণ হরনী ইউনিয়নের দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী কৃষক মো. মহি উদ্দিন। গত শনিবার দুপুরে তিনি জানান, চাতলার খাল এলাকা ২০০৬ সাল থেকে ভাঙছে। এই সময়ের মধ্যে তাঁর বসতবাড়ি অন্তত ৮ থেকে ১০ বার মেঘনার পেটে গেছে। জমিজমা সব হারিয়ে চাতলার খাল এলাকায় তিনি একটি চা দোকান দিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে তাঁর সেই দোকানটিও তিনবার নদীতে তলিয়ে গেছে। চলতি বর্ষা মৌসুমেই শুধু চাতলার খাল এলাকার অন্তত ১০টি দোকান নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
একই দুর্দশার কথা জানান চেয়ারম্যানঘাট এলাকার ব্যবসায়ী ও মন্নান নগর গ্রামের বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন (৫৮)। চানন্দী ইউনিয়নে তাঁর বসতবাড়ি তিনবার নদীতে ভেঙে যাওয়ার পর এখন পরিবার নিয়ে সরকারি ব্যারাকে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, গত এক বছরেই তাদের এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার জমি নদীতে ভেসে গেছে। ঘাসিয়ার চর এলাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম (৫০) জানান, চারবার বাড়ি ভাঙার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড অস্থায়ীভাবে কিছু জিও ব্যাগ ফেললেও তা মূল ভাঙন রোধে কোনো কাজেই আসছে না।

অন্যদিকে নদীপারের নলচিড়া ঘাটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখান থেকেই দূর-দূরান্তের লঞ্চ, সি-ট্রাক, স্টিমার, ফেরিসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল করে। নলচিড়া ঘাট ব্যবসায়ী মো. মাহেরুল ইসলাম মাহের জানান, অব্যাহত ভাঙনে নলচিড়া ইউনিয়নই এখন নদীতে বিলীন হওয়ার পথে। প্রতিদিনই পারের বড় বড় মাটির চাট দেবে যাচ্ছে, যা ব্যবসায়ী ও অধিবাসীদের আতঙ্কের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তমরুদ্দি ইউনিয়নের কোরালিয়া গ্রামের বাসিন্দা নিজাম উদ্দিনের তথ্যমতে, মাইজচরা গ্রাম থেকে কাটাখালী খাল পর্যন্ত দুই কিলোমিটার ভূমি চলতি বর্ষা মৌসুমেই নদীতে চলে গেছে। গৃহ ও 
ভূমিহীন হয়ে পড়া শত শত পরিবার এখন স্থানীয় বেড়িবাঁধে খোলা আকাশের নিচে অমানবিক জীবনযাপন করছে।

হাতিয়া উপজেলার এই ভয়াবহ ভাঙন ও জনদুর্দশার কথা স্বীকার করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল। তিনি বলেন, নদীভাঙনে যারা গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন, তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি খাসজমি, আশ্রয়ণ প্রকল্প, গুচ্ছগ্রাম ও ব্যারাকে স্থান বরাদ্দের কাজ চলছে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করে যাচ্ছে।
ভাঙনের চিত্র তুলে ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড নোয়াখালী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রিফাত জামিল বলেন, ‘প্রতিবছর চার ইউনিয়নে অন্তত এক কিলোমিটার করে জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। পানিপ্রবাহের কারণে এটি ঠেকানো বেশ কঠিন। তবে স্থায়ী প্রতিরোধের জন্য ৯ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে পানি উন্নয়ন বোর্ডে 
পাঠানো হয়েছে। এটি একনেকে পাস হলে মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’ বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে হাতিয়ার চেয়ারম্যানঘাট ও ভূমিহীন বাজারে সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর তীর রক্ষার কাজ চলমান বলে নিশ্চিত করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা।
 

আরও পড়ুন

×