রংপুরে ৪ খুন
বিলম্বে অভিযুক্তদের ডোপ টেস্ট, নতুন বিতর্কে পুলিশ
মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি
হত্যার শিকার সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানরা
সমকাল প্রতিবেদক ও মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৬ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুরে এক পরিবারের চারজনকে খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তার হওয়ার আট দিন পর গত রোববার কারাবন্দি দুই অভিযুক্তের মূত্রের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পুলিশ ডোপ টেস্টের আবেদন করলে শনিবার আদালতে শুনানি হয়। কারাগারের ভেতরে থেকে নমুনা নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তা পরীক্ষা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার ওই পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে রংপুর মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
কেন গ্রেপ্তার হওয়ার আট দিন পর পুলিশ তাদের ডোপ টেস্ট করেছে– এ নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত মাদক সেবনের সাত দিন পেরিয়ে গেলে কারও শরীর থেকে নেওয়া নমুনায় মাদকের অস্তিত্ব ধরা পড়ে না।
রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। দুই আসামির শরীরে এমফিটামিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ঘটনার আট দিন পর আসামিদের মূত্রের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এতদিন পর মূত্রের পরীক্ষায় মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। দু-তিন দিনের মধ্যে পরীক্ষা করলে তা পাওয়া যেত।’
এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় এবং সামাজিক সম্মানের ভয়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর পরিবারের অন্য তিনজনকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস ৮ থেকে ৯টি ইয়াবা বড়ি সেবন করেছিল।
ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, মাদক সেবনের পর সাত দিন পার হলে সাধারণত সংগৃহীত নমুনায় মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। গত রোববার ডিবির একটি দল মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সহযোগিতায় রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে দুই আসামির নমুনা সংগ্রহ করে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. জহুরুল হক বলেন, ইয়াবা খাওয়ার পর ডোপ টেস্ট কতদিন পজিটিভ থাকবে– পরীক্ষার ধরনের ওপর নির্ভর করে। সেবনকারী দিনে কতবার ও কী পরিমাণ সেবন করেছেন এবং শরীরের বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। কম সংখ্যক সেবন করলে এক থেকে তিন দিন, নিয়মিত বা বেশি নিলে তিন থেকে পাঁচ দিন বা কখনও বেশি দিন পজিটিভ থাকতে পারে।
রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, ‘বিষয়টি পরিষ্কার। তারা খুন করেছে। এটি প্রমাণিত। আদালতে জবানবন্দিতে স্বীকার করেছে। কিন্তু একটি মহল মূল বিষয়কে পাশ কাটিয়ে অন্য বিষয়ে তৎপর। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি মাদক সেবন করা-না করার বিষয়টির প্রভাব পড়বে না।’
তিনি আরও বলেন, এতদিন পর প্রস্রাব পরীক্ষায় আগে সেবন করা মাদকের উপস্থিতি সাধারণত শনাক্ত হয় না। ফলে পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ার অর্থ এই নয় যে অভিযুক্তরা হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে মাদক সেবন করেননি।’
এদিকে, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাসকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। দুদিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় নতুন কিছু তথ্য সামনে এসেছে। সেগুলো যাচাই করতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাসকে রিমান্ডের প্রয়োজন। তাই আদালতের কাছে রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল।
পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চায় সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি
এক সপ্তাহের মধ্যে সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ করে বিচার প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি চেয়েছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি। নেতারা বলেছেন, পুলিশ, আইনজীবী ও সরকারি কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি এবং নারী-শিশু ও সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ৭১টি সামাজিক, নারী ও পেশাজীবী সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি আয়োজিত মানববন্ধনে নেতারা এ কথা বলেন। রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষকসহ তাঁর পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের দাবিতে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন প্রাগ্রস্বরের নির্বাহী পরিচালক ফৌজিয়া খন্দকার ইভা, জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা সালমা আলী, মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, নারী প্রগতি সংঘের সেলিনা পারভীন, ঢাকা ওয়াইডব্লিউসিএ অব বাংলাদেশের আহসান হাবীব, আইডি-এর সঞ্চিতা তালুকদার, মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাকসুদা আক্তার লাইলী প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন মহিলা পরিষদের আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি।
ফৌজিয়া খন্দকার ইভা বলেন, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সব সরকারের সময়ই নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা সংঘটিত হতে দেখা যায়।
সালমা আলী বলেন, ‘সাত দিনের মধ্যে এই হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চাই। আমাদের দাবি, নারী, শিশু ও সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’
মালেকা বানু বলেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত শেষ করে আসামিকে গ্রেপ্তার করা এবং তদন্তের বিষয়ে একটি বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এই দ্রুত তদন্ত ও তদন্তের ফলাফল নিয়ে নাগরিক সমাজের মধ্যে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, রংপুরে সপরিবারে শিক্ষক হত্যার ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।