ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধান শিক্ষকের অবসরের অনুষ্ঠান বদলে গেল শেষ শ্রদ্ধায়

প্রধান শিক্ষকের অবসরের অনুষ্ঠান বদলে গেল শেষ শ্রদ্ধায়
×

প্রধান শিক্ষক তপন কুমার সাহার বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত ছিল ক্রেস্ট। ছবি-সমকাল

চাঁদপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:৫৭

দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ দিন। প্রিয় প্রধান শিক্ষককে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাতে বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয়েছিল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। প্রস্তুত ছিল ক্রেস্ট। সহকর্মীরা তৈরি ছিলেন স্মৃতিচারণে, শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল ফুল। দুপুরে ভালোবাসা ও শুভেচ্ছায় শিক্ষককে বিদায় জানানোর কথা ছিল সবার। কিন্তু সেই আয়োজন আর হয়নি। সংবর্ধনার কয়েক ঘণ্টা আগেই এলো তাঁর মৃত্যুর খবর। যে বিদ্যালয় থেকে সম্মানের সঙ্গে অবসর নেওয়ার কথা ছিল, সেখানেই দুপুরে ফিরল তাঁর নিথর দেহ। অশ্রুসিক্ত চোখে প্রিয় শিক্ষককে শেষ বিদায় জানালেন সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।

হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটেছে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার বাকিলা ইউনিয়নের রাধাসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তপন কুমার সাহা (৫৯) সোমবার ভোররাতে চাঁদপুর শহরের নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

তাঁর মৃত্যুর খবরে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। সকাল থেকেই যেখানে একজন শিক্ষককে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি চলছিল, দুপুরের আগেই সেই বিদ্যালয় পরিণত হয় শোকাহত মানুষের মিলনস্থলে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সোমবারই ছিল তপন কুমার সাহার কর্মজীবনের শেষ দিন। দীর্ঘ শিক্ষকতা শেষে অবসর নেওয়ার আগে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাতে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে অতিথিদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ছিল শুভেচ্ছা বক্তব্যের প্রস্তুতি। তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ক্রেস্টও।

বিদ্যালয়ের সহকর্মী তানজিলা আক্তার বলেন, ‘সোমবার দুপুরে স্যারকে অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা দেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। তাঁর হাতে ক্রেস্ট তুলে দেওয়ার কথা ছিল। এর আগেই ভোররাতে খবর আসে, স্যার চাঁদপুর শহরের বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।’

তপন কুমার সাহা ২০০৯ সাল থেকে রাধাসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দীর্ঘ ১৭ বছর একই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা-শুভেচ্ছায় কর্মজীবনের ইতি টানার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই বিদ্যালয় থেকেই তাঁকে নিতে হলো চিরবিদায়।

তাঁর বাড়ি হাজীগঞ্জ উপজেলার বলাখাল এলাকায়। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

তপন কুমার সাহার বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে থাকার কথা ছিল শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসাইন চৌধুরীর। তিনি বলেন, ‘স্যারকে বিদ্যালয় থেকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়ার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। আমিও সেখানে অতিথি হিসেবে থাকার কথা ছিল। কিন্তু তাঁকে ওই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিদায় না দিয়ে আজ চিরবিদায় দিতে হবে, বিষয়টি অনেক কষ্টের। তাঁর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে শিক্ষকসমাজ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই শোকাহত।’

দীর্ঘ ১৭ বছরের শিক্ষকতা জীবনের শেষ দিনে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সহকর্মীদের ভালোবাসায় বিদায় নেওয়ার কথা ছিল তপন কুমার সাহার। সেই বিদায়ের আয়োজনই শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো শেষ শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানে। আনন্দের বদলে বিদ্যালয়জুড়ে নেমে এলো শোক, আর ফুলগুলোও শেষ পর্যন্ত উঠল না প্রিয় শিক্ষকের হাতে, ছড়িয়ে পড়ল তাঁর চিরনিদ্রার পাশে।

আরও পড়ুন

×