রামেক হাসপাতাল হাম অনেকটা নিয়ন্ত্রণে, ডেঙ্গুতে বাড়ছে চাপ
সৌরভ হাবিব, রাজশাহী
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০১:৪১
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে কমেছে হাম সন্দেহে ভর্তি রোগীর চাপ। তবে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। গত আগস্ট মাসের প্রথম দুই সপ্তাহের তুলনায় শেষের সপ্তাহে ডেঙ্গু রোগী দ্বিগুণ বেড়েছে। এরই মধ্যে ডেঙ্গুতে গত আগস্টে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন পাঁচজন। এ ছাড়াও হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর জন্য নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ। শয্যার অভাবে বারান্দা, মেঝে ও দুই বেডের মাঝের ফাঁকা জায়গায় মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের।
রামেক হাসপাতালের তথ্য মতে, গত আগস্টে রামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৩৬ জন। এর মধ্যে প্রথম ১৫ দিনে ভর্তি হয়েছেন ৮৫ জন। তবে এই মাসের পরের ১৫ দিনে ভর্তি হয়েছেন ১৫১ জন। তাদের মধ্যে গত ১০ আগস্ট ও গত ৩১ আগস্ট ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। গত মাসে ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে ১৯৩ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে রামেক হাসপাতালে ডেঙ্গুর আইসোলেশনে ৪৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন।
তাদের জন্য আলাদা করে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে একটি আইসোলেশন করা হয়েছে। সেখানে বেড সংখ্যা রয়েছে মাত্র ১৬টি। সে হিসাবে হাসপাতালে আসনের তুলনায় রোগী প্রায় তিনগুণ। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় ৩০ (এ) নম্বর ওয়ার্ডকেও ডেঙ্গুর আইসোলেশন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই ওয়ার্ড চালু হলে ডেঙ্গু রোগীর জন্য বেড সংখ্যা হবে ৩৬টি।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিন ২৫ নম্বর ওয়ার্ডভুক্ত আইসোলেশনে দেখা যায়, সেখানে রোগীরা বেড ছাড়াও বারান্দা ও দুই বেডের মধ্যবর্তী বিভিন্ন স্থানে মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য ভর্তি রয়েছেন। এতে পুরো ওয়ার্ডের রোগী ও স্বজনরা গাদাগাদি করে মানবেতর সময় কাটাচ্ছেন।
চিকিৎসাধীন এক রোগীর অভিযোগ, এই ওয়ার্ডে স্বাভাবিকভাবে নার্স-ডাক্তাররা একটু কম আসেন। হয়তো তারা ভয়ে থাকেন, তারাও আক্রান্ত হয়ে পড়েন কিনা? চিকিৎসার জন্য সাধারণ কিছু ওষুধ আমরা এখানে পাচ্ছি। বাকি ওষুধ আমাদের বাইরে থেকেই আনাতে হচ্ছে।
আলমগীর হোসেন নামে এক রোগী বলেন, এই গাদাগাদি করে থাকায় আমরা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছি। চিকিৎসার মান নিয়েও আমরা অসন্তুষ্ট। এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। তাই ডেঙ্গু রোগীর দিকে আলাদা নজর দেওয়া উচিত।
হাসপাতালে সিট না পেয়ে মেঝেতেই মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা নেওয়া আরেক রোগী বলেন, দুদিন হলো ভর্তি হয়েছি। এখানে আমাদের জন্য পর্যাপ্ত সিট নেই। চিকিৎসার মানও অত বেশি ভালো না।
চুয়াডাঙ্গার ইউসুফ আলী (৭৫) গত সাপ্তহের মঙ্গলবার ভর্তি হয়েছিলেন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে। এরপর কিছুটা সুস্থ হলে তাঁকে গত সোমবার ছাড়পত্র দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে তিনি ওঠেন রাজশাহীর এক আত্মীয়ের বাসায়। সেখানে গতকাল মঙ্গলবার মারা যান তিনি।
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী বাড়ায় নতুন আরেকটি ওয়ার্ডে আইসোলেশন চালু করা হচ্ছে জানিয়ে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম মাহমুদ সমকালকে বলেন, সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। ডেঙ্গু সন্দেহের রোগীরা প্রাথমিকভাবে মেডিসিন ইউনিটে ভর্তি হন। পরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ফলাফল এলে তাদের আইসোলেশনে নেওয়া হয়। ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের আইসোলেশনে ১৬টি আসন রয়েছে। এ ছাড়াও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের একটি অংশকে আইসোলেশন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, তাদের বেড সংকট দ্রুত কেটে যাবে। এ ছাড়াও আক্রান্তদের আন্তরিকভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে রামেক হাসপাতালের তথ্যমতে, গত আগস্টে হাম সন্দেহে ভর্তি হয়েছে ৮৯ জন। এর মধ্যে ছাড় পেয়েছে ৭৯ জন। বর্তমানে হাম সন্দেহে ২৮ জন চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া গত ১১ আগস্ট একজনের হাম সন্দেহে মৃত্যু হয়েছে।
সরেজমিন হাম ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, হাম আক্রান্ত শিশুর জন্য নির্ধারিত বেডের বেশির ভাগই ফাঁকা। আক্রান্ত শিশুরা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, কেউ কেউ হাতে ক্যানোলা নিয়ে ঘুমাচ্ছে, আবার কেউবা সুস্থতার পর্যায়ে এসে হাসিখুশি অবস্থায় বাবা-মায়ের সঙ্গে খেলছে।
কুষ্টিয়া থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ৮ মাস বয়সী মোস্তাকিম বিল্লাহর দাদা মোহাম্মদ কলিম উদ্দীন বলেন, কুষ্টিয়ায় পাঁচদিন চিকিৎসা করানোর পরে অবস্থার উন্নতি হয়নি। গত শনিবার রাজশাহীতে আসি। এখানে চিকিৎসা ভালোই হচ্ছে। তবে কিছু ওষুধ বাইরে থেকেই কিনতে হচ্ছে।
নার্সদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এখানে নার্সদের শিশুদের চিকিৎসায় অভিজ্ঞতা কম আছে। মোস্তাকিমকে ক্যানোলা পরাতে তারা ছয়-সাতবার সুচ ঢুকিয়েছিলেন। এতে সে অনেক কষ্ট পায় এবং চিৎকার করে কান্না করেছে।