ডেলিভারি কিট ও জরুরি ওষুধের ঘাটতি, সিজার সেবা বন্ধ
পাবনা অফিস
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দুই বছর ধরে কার্যত বন্ধ হয়ে আছে পাবনা মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্রের সব ধরনের অস্ত্রোপচার সেবা। জনবল সংকট, অচল অপারেশন থিয়েটার, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে জেলার একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত প্রসূতি হাসপাতালটি এখন কেবল সীমিত স্বাভাবিক প্রসব সেবার মধ্যে আটকে আছে। ফলে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের অন্তঃসত্ত্বা নারীরা কাঙ্ক্ষিত মাতৃস্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পাবনা শহরের কালাচাঁদপাড়ার মাজেদা খাতুন দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেবেন। নিয়মিত প্রসবপূর্ব সেবার জন্য তিনি এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বেশির ভাগ সময়ই তাঁকে শুধু একটি প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়।
মাজেদা বলেন, ‘এখানে আলট্রাসনোগ্রাম বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রাইভেট ক্লিনিকে যাওয়ার সামর্থ্য নেই বলেই এখানে আসি। কিন্তু বেশির ভাগ সময় শুধু প্রেসক্রিপশন নিয়েই ফিরতে হয়।’ তিনি জানান, প্রথম সন্তানের সময় সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য তাঁকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। এবারও একই পরিস্থিতির আশঙ্কায় তিনি উদ্বিগ্ন।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান কাচারীপাড়ার মীর জাহিদুল ইসলাম। ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়মিত হাসপাতালে নিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পান না। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। এখানে এসে শুধু প্রেসক্রিপশন পাই। তারপরও আসতে হয়, কারণ সরকারি মাতৃত্বকালীন ভাতা পাওয়ার জন্য এই ফলোআপ জরুরি।’
মাজেদা খাতুন ও মীর জাহিদুল ইসলামের মতো বেশ কয়েকজন সেবাপ্রত্যাশী হাসপাতালের এ দুরবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, পাবনার মতো বড় জেলায় সরকারি বিশেষায়িত প্রসূতি হাসপাতালের অস্ত্রোপচার সেবা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি। তাদের মতে, অ্যানেস্থেসিয়া মেশিন প্রতিস্থাপন, অ্যানেস্থেটিস্ট নিয়োগ, জরুরি ওষুধ সরবরাহ এবং ভবনের জরুরি সংস্কার ছাড়া এই হাসপাতালকে কার্যকর করা সম্ভব নয়। তাদের প্রশ্ন, জেলার একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত প্রসূতি হাসপাতাল যদি আলট্রাসনোগ্রাম, জরুরি ওষুধ ও সিজারিয়ান অপারেশন সেবা দিতে না পারে, তাহলে দরিদ্র গর্ভবতী নারীরা নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য কোথায় যাবেন?
২০ শয্যার এই হাসপাতালটি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত। সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সম্পূর্ণ অচল। অ্যানেস্থেসিয়া মেশিন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. ঊর্মি সাহা বলেন, ‘আমাদের দুটি অপারেশন টেবিল থাকলেও অ্যানেস্থেসিয়া মেশিনটি প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকরা এই মেশিন থেকে বৈদ্যুতিক শক পর্যন্ত পেয়েছেন। বছরের পর বছর কোনো নতুন যন্ত্রপাতি বা সরকারি বরাদ্দ আসেনি। কোনো অ্যানেস্থেটিস্ট না থাকায় গত ৬ মাসে একটি সিজারিয়ান অপারেশনও করা সম্ভব হয়নি।’
ডা. ঊর্মি সাহা আরও বলেন, ‘আমরা এখন শুধু স্বাভাবিক প্রসব করাতে পারছি। তারপরও ডেলিভারি কিটের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক সময় দুটি কিট দিয়ে পাঁচটি প্রসব পরিচালনা করতে হয়।’
হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, জুলাই ২০২৫ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত ৬৭৭টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে, অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় ৬১টি। তবে জানুয়ারি ২০২৬ থেকে সিজারিয়ান অপারেশন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। অনুমোদিত আটজন চিকিৎসকের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন, আর অ্যানেস্থেটিস্টের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা দরিভাউডাঙ্গা গ্রামের আমিনা বেগম বলেন, ‘স্বাভাবিক প্রসবের জন্যও বাইরে থেকে এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকার ওষুধ ও স্যালাইন কিনতে হয়। হাসপাতাল থেকে কিছুই দেয় না। জটিলতা দেখা দিলেই অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়।’
ফার্মাসিস্ট মো. কামরুল ইসলাম ওষুধ সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘জরুরি কিছু ওষুধ ও ডেলিভারি-সংশ্লিষ্ট সামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে।’
জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক এ বি এম শরিফুল হক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘দেশের অধিকাংশ পরিবার পরিকল্পনা হাসপাতাল একই ধরনের ওষুধ, সরঞ্জাম ও জনবল সংকটে রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত জানানো হচ্ছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা মৌলিক মাতৃস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’
- বিষয় :
- ডাক্তার