ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেয়েকে দিয়ে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয় ট্রাকচাপায়

মেয়েকে দিয়ে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয় ট্রাকচাপায়
×

শামীম আহমেদ, মাসুক পারভেজ

এম জি আহমেদ আজাদ, নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ)

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

নবীগঞ্জ উপজেলার আলোচিত এক সড়ক দুর্ঘটনার নেপথ্যে ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ডের তথ্য উদ্ঘাটনের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে। দাম্পত্য বিরোধের জেরে শিক্ষক মাসুক পারভেজকে হত্যার ঘটনা লুকানো হয় সড়ক দুর্ঘটনা দিয়ে। হাইওয়ে পুলিশের শ্যেনদৃষ্টি সেই আবরণ ভেদ করে বের করে আনে প্রকৃত চিত্র।
এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের শিকার নিহত পারভেজের সঙ্গে থাকা তাঁর অফিস সহকারী শামীম আহমেদের পরিবারে চলছে আহাজারি। তাঁর মায়ের দাবি, ‘আমার সন্তান তো কোনো দোষ করেনি। তাকে ফিরিয়ে দাও।’  

শুরুতে এই সড়ক দুর্ঘটনা গতানুগতিক ঘটনা মনে হলেও পরে বেরিয়ে আসে মূল সত্য। জানা যায়, সাবেক স্ত্রী হ্যাপী ও তাঁর ছোট ভাই সিরাজুল ছিলেন এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড। বোনের পরিকল্পনা মতো সিরাজুল ইসলাম দুলাভাইকে হত্যা করেন। তবে এখনও কোনো আইনি প্রক্রিয়া না থাকায় বিস্মিত সবাই। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনার পর থেকে চেষ্টা করলেও মামলা নিতে চাচ্ছে না পুলিশ। তবে গতকাল শুক্রবার মামলা দায়েরের জন্য আবার তাদের নবীগঞ্জ থানায় যাওয়ার কথা। এই হত্যাকাণ্ডে শোকাহত নবীগঞ্জ উপজেলার গোল্ডবাভ আব্দুল মান্নান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকমহল।
ঘটনা অনুসন্ধানে জানা যায়, চার মাস আগে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং শিক্ষক মাসুক পারভেজের সাবেক স্ত্রী আমিনা বেগম হ্যাপী মূল পরিকল্পনাকারী। যৌতুক মামলার রায় মাসুকের পক্ষে যাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি এ পরিকল্পনা করেন।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনি
জানা যায়, গত ২৯ আগস্ট শনিবার সকালে আমিনা বেগম তাঁর বড় মেয়ে মিতি বেগমকে ফোন করে জানান, সে যেন তার বাবাকে নতুন কাপড়, জুতা ও একটি ছাতা নিয়ে আসার জন্য বলে। সরল মনে মেয়ে বাবাকে ফোন করলে মাসুক পারভেজ শনিবার দুপুরে নবীগঞ্জ থেকে মোটরসাইকেলে তাঁর সাবেক শ্বশুরবাড়ি উপজেলার পানিউদা গ্রামে যান। সেখানে মেয়ের সঙ্গে দেখা করার পর থেকে চলে আসার সময় আমিনা বেগম তাঁর ভাই সিরাজুল ইসলামকে লেলিয়ে দেন।
পানিউদা থেকে পিছু নিয়ে চার কিলোমিটার দূরে সদরঘাট নতুন বাজার এলাকায় একটি নম্বরহীন ডিআই পিকআপ ট্রাক দিয়ে মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেওয়া হয়। মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে সড়কে পড়ে যান মাসুক পারভেজ। মৃত্যু নিশ্চিত করতে চালক মাসুকের ওপর দিয়ে ট্রাক উঠিয়ে ৫-৬ গজ দূরে নিয়ে একটি মাটির ঢিবির সঙ্গে সজোরে ধাক্কা দেন। এ ঘটনায় মাসুকের সঙ্গে থাকা অফিস সহায়ক শামীম আহমেদও গুরুতর আহত হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
পুলিশের কাছে মূল রহস্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পর শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।

পারিবারিক বিরোধ ও পূর্বপরিকল্পনা
গভীর অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ১২ বছর আগে পানিউদা গ্রামের খাইরুল ইসলামের মেয়ে আমিনা বেগমের সঙ্গে মাসুক পারভেজের বিয়ে হয়। তাদের দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে মিতি ও ছোট মেয়ে মিতু। বিয়ের পর থেকেই বনিবনা না হওয়ায় পাঁচ বছর ধরে আমিনা বেগম দুই সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকেন। চার বছর ধরে তাদের মধ্যে যৌতুকসহ বিভিন্ন বিষয়ে চারটি মামলা চলমান ছিল। সম্প্রতি যৌতুকের একটি মামলায় আদালত মাসুকের পক্ষে রায় দেন এবং আদালত নির্দেশ দেন মাসুক মাসে একবার দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। এতে সাবেক শ্বশুরবাড়ির লোকজন চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

ঘটনার দিন নতুন জুতা ও ছাতা দেওয়ার নাম করে ডেকে এনে পরিকল্পিতভাবেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। অভিযুক্ত সিরাজুল ইসলাম ঘটনার দুই মাস আগে স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি রেজিস্ট্রেশনহীন ডিআই পিকআপ ভ্যান কেনেন। ঘটনার দিন পানিউদা বাজার থেকে গাড়িটি নিয়ে তিনি মাসুকের পিছু নেন এবং এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে এলাকাবাসী তাঁকে আটক করে স্থানীয়দের জিম্মায় দেন।
শামীমের পরিবারের কান্না ও বিচার দাবি
শামীম আহমেদের বাবা ইসমত মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল। সে শুধু বন্ধু মাসুকের সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল। ফেরার পথে তার শ্যালক ট্রাকচাপা দিয়ে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই।’

শামীমের মা করুণা বেগম বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই। আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল যে তাকে এভাবে হত্যা করা হলো? সরকার কি লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর কোনো বিচার করবে না? আমার ছেলে বলছিল বাড়ি এসে ভাত খাবে, কিন্তু সে আর ফিরল না।’
গোল্ডবাভ আব্দুল মান্নান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামাল উদ্দিন বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুক পারভেজ ও পিয়ন শামীম আহমেদ মোটরসাইকেলে করে আসার পথে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। হাইওয়ে পুলিশ সব জানার পরও মামলা নিতে কিছুটা গড়িমসি করছে।
প্রত্যক্ষদর্শী বাউল শামীম ও স্থানীয় যুবক আরিয়ান হাসান জানান, ট্রাকটি যেভাবে পেছন থেকে এসে মোটরসাইকেলটিকে প্রথমে চাপা দেয় এবং পড়ে যাওয়ার পরও চালক ইচ্ছাকৃতভাবে চাকা উঠিয়ে দেয়, তা দেখে তারা চরমভাবে আতঙ্কিত ও স্তব্ধ হয়ে গেছেন।
শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি আনিসুর রহমান বলেন, ঘটনাটি নিয়ে আমরা পাঁচ দিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে বেশ কিছু ক্লু পেয়েছি। চালক তাঁর বোনের জামাইকে চাপা দিয়েছেন। লাইসেন্সবিহীন গাড়ি দিয়ে কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। হত্যা মামলা গ্রহণের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×