বরিশাল বিভাগে লোডশেডিং
গড়ে অন্তত ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না হাসপাতালে
জেনারেটর নেই বেশির ভাগ হাসপাতালে
ফাইল ছবি-সংগৃহীত
সুমন চৌধুরী, বরিশাল
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৫ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দক্ষিণে সাগরকূলের শেষ জনপদ বরগুনার পাথরঘাটা। এই উপজেলার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে রয়েছে ৫০ শয্যার একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। গত মঙ্গলবার রাত ১১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত পাঁচ ঘণ্টায় ১৭ বার এই হাসপাতালের বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করেছে। প্রতিবারই ১০ থেকে ৩০ মিনিট করে বিদ্যুৎ ছিল না। ফলে প্রচণ্ড গরমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীরা বেকায়দায় পড়েন। যেসব রোগী উঠে বসতে পারেন, তারা বিছানা ছেড়ে বাইরে গিয়ে বসে ছিলেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মেহেদী হাসান জানান, এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি জেনারেটর থাকলেও সেটি সচল নয়।
শুধু পাথরঘাটাই নয়, বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা সদর হাসপাতাল ও ৩৫ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির একই দশা। কিছু কিছু হাসপাতালে জেনারেটর আছে, কিন্তু তেল সংকট দেখিয়ে চালানো হয় না। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এক বছর ধরে জ্বালানি বরাদ্দ বন্ধ। তবে বেশির ভাগ হাসপাতালে জেনারেটরই নেই। ফলে বিদ্যুতের চলমান সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও স্বজনরা।
জেলা-উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসক, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে অন্তত ৮ ঘণ্টা হাসপাতালে বিদ্যুৎ থাকে না। বিকল্প ব্যবস্থাও নেই এসব হাসপাতালে। জরুরি অস্ত্রোপচার কার্যক্রমও তখন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে লোডশেডিংয়ের সময় রোগী ও স্বজনদের দুঃসহ সময় কাটাতে হয়।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা হিসেবে জেনারেটর সরবরাহ করা হয়নি। ছয়টি জেলা সদর হাসপাতাল ও ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর আছে। এর মধ্যে ১০টি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অচল। অর্থ বরাদ্দের অভাবে জ্বালানি কিনতে না পারায় এসব জেনারেটর চালানো হয় না। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে প্যাথলজি বিভাগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ থাকছে; অস্ত্রোপচার কক্ষে ব্যাহত হচ্ছে জরুরি অস্ত্রোপচার।
পটুয়াখালী শহরে ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা জানান, এ হাসপাতালে জেনারেটর আছে। তবে জেনারেটরের বিদ্যুৎ সংযোগ হাসপাতালের বিশেষ কিছু জায়গার জন্য নির্ধারিত। সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর ও ফুয়েল ব্যবহারের ব্যবস্থা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তেনমং জানান, হাসপাতালে জেনারেটর আছে; তেল সরবরাহ না থাকায় চলানো হয় না। বর্তমানে জেনারেটরের ব্যাটারি নষ্ট। লোডশেডিংয়ের সময় আইপিএস দিয়ে আলোর ব্যবস্থা হলেও ফ্যান বন্ধ থাকে।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মেহেদী হাসান বলেন, লোডশেডিংয়ের জন্য দিনের তিন ভাগের এক ভাগ সময় রোগীদের বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হয়। তখন অস্ত্রোপচারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো লাভ হয়নি।
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমরানুরের ভাষ্য, নিজস্ব অর্থায়নে জেনারেটর কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে সরকারিভাবে জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় ওই সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসেছি।
বরিশাল নগরীতে ১০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের একমাত্র জেনারেটরটি কবে থেকে বিকল, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. মলয় কৃষ্ণ বড়াল জানান, তিনি অনেক বছর আগে এ হাসপাতালে যোগদান করে জেনারেটরটি বিকল অবস্থায় পেয়েছেন। করোনা মহামারির সময়ে সেটি সচল করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু প্রকৌশলীরা জানিয়ে দিয়েছেন, এটি আর সচল হবে না।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের পরিচালক ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার জানিয়েছেন, বিভাগের ছয় জেলা শহরে ছয়টি ও ৩৫টি উপজেলায় হাসপাতাল রয়েছে। বেশির ভাগের জেনারেটর বিকল। তবে এর সঠিক সংখ্যা তিনি তাৎক্ষণিক দিতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য, জ্বালানির জন্য অর্থ বরাদ্দ খুবই সীমিত, যে কারণে কোনো হাসপাতালেই জ্বালানি বরাদ্দ দেওয়া হয় না। চলমান লোডশেডিংয়ে হাসপাতালগুলোর অচলাবস্থার সার্বিক পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।