ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

নিয়ম ভেঙে ৮ শিক্ষকের বদলি, শিক্ষকশূন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়

সংকটে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা

নিয়ম ভেঙে ৮ শিক্ষকের বদলি, শিক্ষকশূন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়
×

ছবি-সমকাল

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:৩০ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:৪৭

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের আন্তঃউপজেলা বদলি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জ্যেষ্ঠতার বিধান লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলি কমিটির অনুমোদিত ১১ জন সহকারী শিক্ষকের বদলি আদেশের মধ্যে অন্তত আটজনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশিকা মানা হয়নি বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নেতারা। 

অনিয়ম ও খামখেয়ালিপূর্ণ এই বদলির কারণে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার কোনো কোনো বিদ্যালয় সম্পূর্ণ শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়েছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষকসংকট ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৮ জন শিক্ষক আন্তঃউপজেলা বদলির আবেদন জানান। অনলাইন ও অফলাইন যাচাই-বাছাই শেষে বদলি কমিটি ১১ জনের আবেদন অনুমোদন করে। তবে প্রাথমিক শিক্ষক বদলির বিদ্যমান নীতিমালায় ‘পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক কর্মরত থাকা বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষককে বদলি করা যাবে না’– বলে স্পষ্ট নির্দেশ থাকলেও চিলমারীতে তা সরাসরি উপেক্ষা করা হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়টি ধরা পড়ে। দেখা গেছে, গৌড়মোহনহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারজন অনুমোদিত শিক্ষকের পদের বিপরীতে মাত্র একজন শিক্ষক (মো. নুর আলম) কর্মরত ছিলেন। কিন্তু বদলি তালিকার ৫ নম্বর ক্রমিকে থাকা এই একমাত্র শিক্ষককে রাজারভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করায় প্রতিষ্ঠানটি এখন পুরোপুরি শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়েছে।

নটারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আটটি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন মাত্র চারজন শিক্ষক। বদলি তালিকার ৩ নম্বরে থাকা মো. বাবলু মিয়াকে বদলি করায় বর্তমানে ২৩২ জন কোমলমতি শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে ঢিমেতালে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।

মুদাফৎ কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫২ জন শিক্ষার্থীর জন্য নির্ধারিত ছয়টি পদের মধ্যে কর্মরত ছিলেন মাত্র দুইজন শিক্ষক। বদলি তালিকার ১১ নম্বরে থাকা মাসুমা আক্তারকে সরিয়ে নেওয়ায় এখন পুরো বিদ্যালয় সামলানোর কঠিন দায়িত্ব এসে পড়েছে এক শিক্ষকের ওপর।

উত্তর খাউরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি পদের বিপরীতে থাকা তিনজন শিক্ষকের একজন আগেই পিটিআই প্রশিক্ষণে ছিলেন। বদলি তালিকার ৯ নম্বর ক্রমিকে থাকা মো. মোবারক হোসেনকে বদলি করায় ৯০ জন শিক্ষার্থীর জন্য অবশিষ্ট রইলেন মাত্র একজন শিক্ষক।

এ ছাড়া ছালীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫১ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে থাকা চারজন শিক্ষকের মধ্য থেকে মো. মনোয়ারুল ইসলামকে (ক্রমিক ৮) বদলি করায় সংকট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ১০ নম্বর ক্রমিকে থাকা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জোনাব আলী এবং নাওশালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তামান্না ইসলাম তৃষাসহ অন্যদের বদলিতে জ্যেষ্ঠতার জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ তুলে চর মুদাফৎকালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিয়ারা খাতুন বলেন, ‘বদলি প্রক্রিয়ায় সরকারি নীতিমালার কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি। প্রভাবশালী শিক্ষক নেতাদের যোগসাজশে অনৈতিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে এই অনিয়ম করা হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরা।’

বিধি ভঙ্গের বিষয়ে জানতে চাইলে বদলি কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে একক শিক্ষক থাকা বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নতুন শিক্ষক যোগ না দেওয়া পর্যন্ত বর্তমানদের ছাড়পত্র (রিলিজ) দেওয়া হবে না।’ তবে জ্যেষ্ঠতার নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। একইভাবে যাবতীয় অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করেছেন বদলি কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান। তাঁর ভাষ্য, সরকারি আইন ও শিক্ষা দপ্তরের নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে মেনেই যাচাই-বাছাই করে বদলি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী দায় এড়িয়ে জানান, বদলি কমিটিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা রয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠান শূন্য রেখে বদলির সুযোগ নেই; তবে লিখিত অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×