ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

গবেষণা

কাপ্তাই হ্রদের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা

কাপ্তাই হ্রদের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা
×
×

ছবি: সমকাল

সত্রং চাকমা, রাঙামাটি

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:২৮

কাপ্তাই হ্রদের মাছ, পানি ও মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। হ্রদে প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিনের দূষণ বাড়তে থাকায় জলজ পরিবেশের পাশাপাশি মানবস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবেষকদের মতে, প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বিভিন্ন গবেষণায় কাপ্তাই হ্রদের মাছ ও পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় রুই, কাতলা, কালবাউশ, তেলাপিয়া এবং কাচকি ও চাপিলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব নমুনার বিশ্লেষণে মাছের পরিপাকতন্ত্রে প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র তন্তু, নাইলনের কণা এবং প্লাস্টিকজাত বর্জ্যের ভাঙা অংশ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী স্প্রিং ন্যাচার লিংক ও সায়েন্স ডাইরেক্টে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

গবেষণার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কাপ্তাই হ্রদের রিজার্ভ বাজার, শুভলং বাজার ও বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ঘাট এলাকা থেকে মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পাঁচ ধরনের দেশি ছোট মাছের ৭৫টি নমুনার সব কটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে টেংরা মাছে সর্বাধিক মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয় (০.৬৩ গ্রাম)। মাছ ধরার সরঞ্জাম ও বাসাবাড়ির প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে আসা ফাইবার বা তন্তু  শতকরা ৮৫ ভাগ এবং পলিথিন পলিমার শতকরা ৭১ভাগ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। তবে ছোট আকারের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বেশি। তবে এসব ফলাফল নির্দিষ্ট নমুনা ও গবেষণার পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

গবেষকদের মতে, মাছ ধরার সরঞ্জাম, গৃহস্থালির প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পলিথিন থেকে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মাছের আকার ও প্রজাতিভেদে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের মাত্রায় পার্থক্য থাকতে পারে। মাছের শরীরে এসব কণা জমলে খাদ্য গ্রহণ, বৃদ্ধি, প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের সঙ্গে কাজ করা মৎস্য গবেষক মো. মঈনউদ্দীন পাঠান বলেন, সম্প্রতি কাপ্তাই হ্রদের পানি ও মাটি নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। সেখানেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ-সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফল সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাঈফুদ্দিন রানা বলেন, কাপ্তাই হ্রদের মাছের মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। মূলত সচেতনতা বাড়ানোর জন্য এ গবেষণা করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কাপ্তাই হ্রদের মাছ খাওয়া যাবে না। প্লাস্টিকদূষণ বন্ধ করাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

সাঈফুদ্দিন রানা আরও বলেন, আজ হ্রদে ফেলা প্লাস্টিকের বোতল বা অন্যান্য বর্জ্য দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশে থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। তাই দূষণের উৎস বন্ধ করতে হবে।

রাঙামাটি মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম বলেন, কাপ্তাই হ্রদের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণার কথা তিনি শুনেছেন। তারাও এ বিষয়ে গবেষণা করার পরিকল্পনা করছেন। হ্রদে প্লাস্টিক ও পলিথিনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাঙামাটির সিভিল সার্জন নুয়েন খীসা বলেন, মাছের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতি নাও হতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিপাকতন্ত্র, কিডনি ও যকৃতের ক্ষতির মতো সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান তিনি।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, কাপ্তাই হ্রদকে দূষণমুক্ত রাখতে প্রশাসন কাজ করছে। দোকানি ও ব্যবসায়ীদের বর্জ্য রাখার জন্য ঝুড়ি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। হ্রদে যারা পরিবেশদূষণ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১৯৬২ সালে তৈরি কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ রাঙামাটি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলাধার। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটকদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লেটসহ বিভিন্ন বর্জ্য হ্রদের দূষণ বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

রাঙামাটি পৌর এলাকার বর্জ্যের একটি অংশ সরাসরি হ্রদের পানিতে গিয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। গবেষকরা বলছেন, পর্যটন মৌসুমে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যও দূষণের একটি উৎস। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, পানির স্রোত ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় এসব প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হতে পারে। পরে তা পানি, তলদেশের মাটি ও জলজ প্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন

×