ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

‘সবার ঘরে পূজার আনন্দ আমাদের পরিবারে নেই’

‘সবার ঘরে পূজার আনন্দ  আমাদের পরিবারে নেই’
×
×

কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্গাপূজায় সবার ঘরে ঘরে আনন্দ। তবে পাঁচ বছর ধরে সেই আনন্দ নেই রুপা রানী দাসের ঘরে। ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুরে অবস্থিত কালীবাড়ি মন্দিরের সামনে সহিংসতায় প্রাণ হারান তাঁর স্বামী দিলীপ কুমার দাস (৬০)। পরবর্তীকালে এই দম্পতির দুই সন্তান পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমান বিদেশে। সেই থেকে প্রতি রাত নির্ঘুম কাটে রুপা রানী দাসের। দুর্গাপূজার সময় দুঃসহ স্মৃতি তাড়া করে তাঁকে। 

দিলীপ কুমার দাসের হত্যাকাণ্ডটি ঘটে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার জেরে। ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর ছিল দুর্গাপূজার অষ্টমী। সেদিন ভোরে নগরীর নানুয়াদিঘির পাড়ে পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনীসহ কয়েকটি জেলায় সহিংস ঘটনায় নিহত হন আরও সাতজন। হামলা হয় হিন্দুধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মণ্ডপ-মন্দিরে। এসব ঘটনায় মোট মামলা হয় ৫৪টি। এর মধ্যে কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় একটি হত্যাসহ ১২টি মামলা হয়। নোয়াখালীতে ১৪ ও ১৫ অক্টোবরের ঘটনায় মামলা হয় ৩২টি। ১৩ অক্টোবর চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে সহিংসতার ঘটনায় আরও ১০টি মামলা হয়। 

কুমিল্লার ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় আটটি, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় দুইটি এবং দেবিদ্বার ও দাউদকান্দি মডেল থানায় একটি করে মামলা হয়। ২০২২ ও ২০২৩ সালে সিআইডি ছয়টি, পিবিআই তিনটি ও কোতোয়ালি থানা পুলিশ দুটি মামলাসহ ১১ মামলায় ২৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। দেবিদ্বার থানার মামলাটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পিবিআই। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিসি ক্যামেরার সূত্র ধরে ঘটনার পরদিন কক্সবাজার থেকে প্রধান আসামি ইকবাল হোসেনকে আটক করে পুলিশ। ৩০টি মামলায় আসামি তিনি।
সিআইডির তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তারা যে ছয়টি মামলার তদন্ত করছেন, এর মধ্যে মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় ইকবালসহ পাঁচজনকে আসামি করে একটি ও বাকি মামলাগুলোতে ১০৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। পিবিআই কুমিল্লার পরিদর্শক বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রেখে প্রথমে ফেসবুক লাইভে ঘটনাটি ছড়িয়ে দেন মামলার একমাত্র আসামি গোলাম মাওলা। তিনি লাইভে স্পর্শকাতর বিষয়টি না দেখালে সহিংসতা হতো না। সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। 

বিচার নিয়ে শংকায় দিলীপের পরিবার
কালীবাড়িতে হামলায় নিহত দিলীপ কুমার দাসের একমাত্র মেয়ে প্রিয়া রানী দাস স্টুডেন্ট ভিসায় ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় যান। গত রোববার বিকেলে মোবাইল ফোনে প্রিয়া রানী দাস বলেন, ‘আমার বাবার রক্তাক্ত মরদেহ ও মাথার আঘাত আমি দেখেছি। এ আঘাত শুধু ইটের আঘাত নয়। ধারালো অস্ত্রেরও আঘাত ছিল। আমার মনে হয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও ভালোভাবে আসেনি। কারা বাবার হত্যায় জড়িত তা আজও জানা হলো না।’ বাবা হত্যার বিচার নিয়ে শঙ্কিত তিনি। তাঁর একমাত্র ভাই পার্থ দাস ডেনমার্ক আছে।
মামলার বাদী প্রিয়ার মা রুপা রানী দাস বলেন, ‘মামলার কি অবস্থা জানি না। ৫ মাস আগে একবার আদালতে গিয়েছিলাম। সাক্ষ্য নেওয়ার কথা ছিল। এদিন আর সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি।’ 

৩০ মামলায় আসামি ইকবাল
কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা যায়, মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রেখে অবমাননার ঘটনায় আলোচিত ইকবালের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা, ধর্ম অবমাননা ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কুমিল্লাসহ সারাদেশে ৩০ মামলা রয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরের ঘটনায় ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল এক মামলায় ২০২৩ সালের ২ মার্চ ইকবালকে এক বছর চার মাসের কারাদণ্ড দেন।
কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহ আলম খান বলেন, মামলায় হাজিরার প্রয়োজনেই ইকবালকে বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সে কুমিল্লা কারাগারে আছে। 
কুমিল্লা আদালতের পিপি কাইমুল হক রিংকু সমকালকে বলেন, মণ্ডপের মামলাগুলোর অধিকাংশ আসামি পলাতক। এজন্য কিছু মামলার চার্জ গঠনও দেরিতে হয়েছিল। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি, মালপত্র ক্রোক, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি জারিসহ কিছু আইনি প্রক্রিয়া চলছে। তাই সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে বিচার শেষ ও রায় দিতে আর কিছু সময় লাগতে পারে। তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রধান আসামি ইকবাল ছাড়া অন্যরা সবাই জামিনে আছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ইকবালের জামিন আবেদনের শুনানি ছিল। কিন্তু তার জামিন হয়নি বলেও নিশ্চিত করেন তিনি। 

আরও পড়ুন

×