ঢাকা শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব’, তিতাসের স্ত্রীর আহাজারি

ফরিদপুরের বাড়িতে জানাজা, স্বজনের অশ্রুতে চিরবিদায় 

‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব’, তিতাসের স্ত্রীর আহাজারি
×
×

ফরিদপুর অফিস

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ২২:০৫

‘মা, আগামীকাল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো।’ রেখা বেগমের সঙ্গে ছেলে তিতাস শেখের এটাই ছিল শেষ কথা। গত বুধবার রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে কর্মরত সেনাসদস্য ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁর। সেই স্মৃতি এখন তাড়া করে ফিরছে রেখা বেগমকে। সন্তানের শোকে তিনি পাগলপ্রায়। স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। একই অবস্থা বাবা আফজাল শেখেরও। তাঁর দুই চোখ বেয়ে অনবরত ঝরছে অশ্রু।

শুক্রবার ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তিতাসের স্বজনদের কান্না-আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। তাঁদের শোক ছুঁয়ে গেছে প্রতিবেশী ও সহকর্মীদেরও। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার গহিন পাহাড়ে অভিযানে অংশ নেন তিতাস। সেখানে মানব পাচারকারীদের গুলিতে নিহত হন তিনি।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে টেকনাফে মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হয়। এ সময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে আহত হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। বুকের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল শেখের তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে সবার বড় তিতাস। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। ছোট ভাই আকাশ শেখও সেনাবাহিনীতে কর্মরত। স্বজনেরা জানান, ২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস। তিনি ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী সেনা ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দুই মাসের ছুটি কাটিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর কর্মস্থলে ফেরেন তিনি।

চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়া আক্তারকে বিয়ে করেন তিতাস। তাঁদের কোনো সন্তান নেই। আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু একটি গুলিতে থেমে গেল তিতাসের পথচলা।

স্বামীকে হারিয়ে দীর্ঘ সময় কথাই বলতে পারেননি সুমাইয়া। তাঁকে থেমে থেমে বিলাপ করতে শোনা যায়। তিনি বলছিলেন, ‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব! আমার কোনো অস্তিত্ব রইল না! আল্লাহ, আমি এখন কী করব!’

সন্তানের শোকে পাগলপ্রায় মা রেখা বেগমও। তিনি জানান, গত বুধবার রাতে ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয় তাঁর। তিতাস বলেছিলেন, ‘আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো, মা।’ ছেলের এই কথাই যে শেষ কথা হয়ে থাকবে, তা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি তিনি। এ কথা বলতে বলতে বিলাপ শুরু করেন রেখা বেগম।

শুক্রবার বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দা সদরের মাহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে পৌঁছায়। পদ্মা সেনানিবাস ক্যাম্পের ১৫ রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মেজর সোহেল আহমেদের নেতৃত্বে একটি দল মরদেহ গ্রহণ করে। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তা নেওয়া হয় লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে।

মাগরিবের নামাজের পর সেখানে তিতাসের জানাজা হয়। এরপর মরদেহ নেওয়া হয় বাড়িতে। স্বজনদের আহাজারিতে সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় লস্করদিয়া পশ্চিমপাড়া কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

এ সময় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এবং পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পরে সাতজন সৈনিক তিন দফায় ২১টি গুলি ছুড়ে সেনাসদস্য তিতাসকে শেষ বিদায় জানান।

জানাজার আগে পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন তিতাসের মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল তালুকদার। ভাগনের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, ‘দেশকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে আর কারও সন্তানকে এভাবে প্রাণ দিতে হবে না। কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।’

এ ছাড়া বক্তব্য দেন রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পের ১ বীর ইউনিটের ক্যাপ্টেন সাজিদ, নগরকান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খায়রুল হাসান, নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সামদানি রাসুল আযাদ প্রমুখ।

আরও পড়ুন

×