বীরাঙ্গনার দুঃখগাথা
আবাস ও চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন কমলা
রেজিয়া বেগম কমলা
মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:৩৬
ক্যান্সার আক্রান্ত বীরাঙ্গনা রেজিয়া বেগম কমলার চিকিৎসা আটকে আছে অর্থাভাবে। ছেলের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিক্রি করে একটি কেমোথেরাপি দিলেও বাকি আরও পাঁচটি। স্বামী মারা যাওয়ার পর ভিটে ছাড়া হওয়া কমলার ঠাঁই হয়েছে রেলওয়ের পরিত্যক্ত জমিতে। সেখান থেকেও উঠিয়ে দিতে চলছে নানা হুমকি-ধমকি। ওই অবস্থায় অসুস্থ বীরাঙ্গনা মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। প্রশাসনের কাছে আবাস ও চিকিৎসার অর্থ সহায়তার আবেদন করেও সাড়া মেলেনি। এতে অসহনীয় দুরবস্থায় দিন কাটছে ময়মনসিংহ নগরীতে অবস্থান করা বীরাঙ্গনার।
বীরাঙ্গনা রেজিয়া বেগম কমলার বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের নওবাইত গ্রামে। ওই গ্রামের প্রয়াত আবদুল আজিজের মেয়ে তিনি। ২০১৭ সালের ১৩ জুন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান তিনি। তিনি বর্তমানে বসবাস করেন ময়মনসিংহ নগরীর চরকালীবাড়ি (মিলগেট) এলাকায় রেলওয়ের পরিত্যক্ত জমিতে। গত দশ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন। অন্তত ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে দালালের মাধ্যমে আশ্রয় পেতে হয়েছে পরিত্যক্ত জমিতে। এর আগে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে চা দোকানে কাজ করে দুই ছেলেকে বড় করেছেন তিনি। কমলার দুই ছেলে আবু হানিফ (৩৮) ও আবুল কায়সার মানিক (৩৪) পরিবহন শ্রমিক। অভাবের কারণে ছেলেরা পড়ালেখা করতে পারেননি।
ক্যান্সারে ধুঁকছেন বীরাঙ্গনা: ৫ বছর আগে বুকের বাম পাশে টিউমারের মতো দেখা দেয়। যন্ত্রণা শুরু হয় বীরাঙ্গনা রেজিয়া বেগম কমলার। সহ্য করতে না পেরে গেল বছরের ডিসেম্বরের দিকে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য যান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। বিষয়টি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা বিমল পালকে জানানো হলে তিনি ময়মনসিংহ সিএমএইচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে সেখান থেকে ঢাকা সিএমএইচে করানো হয় অপারেশন। ধরা পড়ে ক্যান্সার। ছেলের একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ৫৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে মার্চের দিকে একটি কেমোথেরাপি দেন। আরও ৫টি কেমোথেরাপি দিতে হবে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। ভাতার ১২ হাজার টাকা দিয়ে সংসার ও নিজের চিকিৎসা চালানো দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে করোনার কারণে সব আটকে গেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরে চিকিৎসা সহায়তার জন্য আবেদন করেও সাড়া মেলেনি।
বীরাঙ্গনার একাত্তরের দিনগুলো: একাত্তরের সেই দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে বীরাঙ্গনা রেজিয়া বেগম কমলা জানান, যুদ্ধ শুরু হলে তাদের বাড়ির কাছের বালিয়া স্কুলে ক্যাম্প করেছিল পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। যুদ্ধ চলাকালীন মেয়েকে পাকিস্তানিদের হাত থেকে রক্ষায় বাবা আবদুল আজিজ নানসিঁড়ি গ্রামের কৃষক কডু মিয়ার কাছে বিয়ে দিয়ে দেন। মেয়েকে সুখে রাখতে তখন ১০ কাঠা জমিও দেন বাবা। বিয়ের দ্বিতীয় দিনের মাথায় স্বামী ও শ্বশুর ভারতে চলে যান। নববধূকে বাড়িতে রাখা ঝুঁকি ভেবে বাবার বাড়িতে পৌঁছে দিতে নিয়ে যান শাশুড়ি। পথে আসলামের কবলে পড়েন কমলা। বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে তুলে দেন বালিয়া স্কুল ক্যাম্পের পাকিস্তানিদের হাতে। সেখানে টানা সাত দিন চলে নারকীয় নির্যাতন। সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য সখ্য গড়ে তোলেন রাজাকার আসলামের সঙ্গে। ক্যাম্প থেকে কৌশলে বের হয়ে পাশের খালে কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে পড়েন তিনি। পরে সেখান থেকে রাতে পাশের একটি গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেন। এক বাড়ি থেকে ছেঁড়া লুঙ্গি নিয়ে তা দিয়ে নিজেকে ঢাকেন। ভোরে এলাকার মানুষ হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে যেতে শুরু করলে তাদের সঙ্গে তিনিও যোগ দেন। হালুয়াঘাটের কড়ইতলী সীমান্তে কিছু মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে মিলিত হয়ে সহযোগিতা শুরু করেন। অন্তত ১৬ সদস্যের মুক্তিযোদ্ধার টিমে তিনি ছাড়াও আরও তিন নারী সহযোগিতা করতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাসখানেক আগে ময়মনসিংহের বেগুনবাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা আনসার মাস্তানের বাড়িতে কমলাকে রাখা হয়। সেখান থেকে আনসার মাস্তান চাচাবাড়ি পৌঁছে দেওয়া জন্য ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে দেন। পরে আর বাড়িতে যাওয়া হয়নি তার। এক বিহারি নারীর ভাতের হোটেলে উচ্ছিষ্ট খেয়ে আর রেলওয়ে স্টেশনের পাশ থেকে দিন কাটানোর মধ্যেই দেশ স্বাধীন হয়। এরপর স্বাধীনতার সাত বছর পর নগরীর নতুনবাজার এলাকায় তৎকালীন মোনায়েম খান এতিমখানার করনিক মো. আবুল কাশেম বিয়ের প্রস্তাব দেন। বিবাহিত জেনেও কাশেমের সঙ্গে সংসার পাতেন কমলা। কাশেমের বাড়ি নগরীর দাপুনিয়া এলাকায়। ১৯৯৪ সালে বাড়ি থেকে সন্তানদেরসহ বের করে দেওয়া হয় কমলাকে। 'কলঙ্কিনী'কে রাখতে চাননি শাশুড়ি ও ভাসুর। পরে নগরীর ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এক নারীর আশ্রয়ে থেকে চা দোকানে কাজ শুরু করে সন্তানদের বড় করে তোলেন তিনি।
কম্বোডিয়ায় শুনিয়েছেন বিভীষিকার কথা: পৃথিবীতে হওয়া বিভিন্ন দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও নির্যাতনের বর্ণনা শোনার জন্য জাতিসংঘ সেমিনারের আয়োজন করে। কম্বোডিয়ায় সেমিনারে অংশ নেন বীরাঙ্গনা রেজিয়া খাতুন কমলাও। তিনি ছাড়াও তার সঙ্গে আরও এক বীরাঙ্গনা যান সে দেশে। ২০১২ সালে কম্বোডিয়ায় শুনিয়ে আসেন একাত্তরে হওয়া নিজের ওপর নির্যাতনের কথা।
আবাসন প্রাপ্তির আবেদনে অগ্রগতি নেই: বীরাঙ্গনা রেজিয়া বেগম কমলার স্বামী মারা যাবার ৮ দিনের মাথায় তাকে 'কলঙ্কিনী' নাম দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। ময়মনসিংহ নগরীর নানা জায়গায় ভাড়া থেকে জীবনের ক্রান্তিলগ্নে ঠাঁই নিয়েছেন রেলওয়ের পরিত্যক্ত জমিতে। সেই জমিতে স্বজনরা ছোট্ট একটি ঘর করে দিয়েছেন। সেখানেই দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন কমলা। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আবাসন নির্মাণ প্রকল্প থেকে ভূমিহীন কমলার আবাসের ব্যবস্থা করার জন্য চলতি বছরের ১১ মার্চ প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেটির কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আক্ষেপ করেন তিনি।
মা বীরাঙ্গনা হওয়ায় বিয়ে করতে পারছেন না ছেলেরা: বীরাঙ্গনার দুই ছেলের বয়স বাড়লেও তাদের ভাগ্যে বিয়ে জুটছে না। বিয়ের আলাপ শুরু হলেই মানুষ ভেঙে দেয়। মা বীরাঙ্গনা ছিলেন- এ কথা শুনে কেউ বিয়েতে রাজি হন না। বীরাঙ্গনা রেজিয়া বেগম কমলা বলেন, কলঙ্ক নিয়ে বেঁচে রয়েছি। মানুষ শুনলে ঘৃণার চোখে দেখে। সব মুক্তিযোদ্ধা যদি ভালো থাকে তবে আমার কেন এ অবস্থা? তিনি আরও বলেন, আমার কষ্টের কথা প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই। চিকিৎসা ও স্থায়ী আশ্রয় চাই।
ময়মনসিংহ মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের প্রাক্তন সহকারী কমান্ডার (প্রচার ও পুনর্বাসন) বিমল পাল বলেন, কমলার চিকিৎসার জন্য তিনি নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। অর্থাভাবে কেমোথেরাপি দেওয়া যাচ্ছে না। সমাজসেবা অধিদপ্তরে আবেদন করলেও অগ্রগতি নেই। ভূমিহীন বীরাঙ্গনা আবাসনের জন্য আবেদন করলেও সেটিরও কোনো অগ্রগতি নেই। দ্রুত বীরাঙ্গনার চিকিৎসা ও স্থায়ী আবাসের ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান তিনি।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান বলেন, তার তথ্য চাওয়া হয়েছে। আমরা তার থাকার একটা ব্যবস্থা করে দেব। চিকিৎসার বিষয়টিও দেখা হবে।
