বরিশালে গ্রেপ্তারের পর শিক্ষানবিশ আইনজীবীর হাসপাতালে মৃত্যু
রেজাউল করিম রেজা
বরিশাল ব্যুরো
প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২১ | ০৮:২২
বরিশাল নগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে মারা গেছেন শিক্ষানবিশ আইনজীবী রেজাউল করিম রেজা (৩০)। হাসপাতালের প্রিজন সেলে শনিবার রাত ১২টায় তিনি মারা যান। তার আগে শুক্রবার রাত ৮টায় তাকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে শেবাচিম হাসপাতালে আনা হয়। পুলিশি নির্যাতনে রেজাউলের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি স্বজনদের।
গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টায় নগরীর সাগরদী আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন হামিদ খান সড়ক থেকে রেজাউলকে আটক করেছিলেন বরিশাল নগর ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক মহিউদ্দিন মাহি। ওই রাতেই তাকে চার পিস নেশা জাতীয় ইনজেকশন ও ১৩৮ গ্রাম গাঁজাসহ গ্রেপ্তার দেখিয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়। পরদিন বুধবার রেজাউল করীমকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
রেজাউলের মৃত্যুর খবরে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা রোববার হাসপাতালে ছুটে যান। তাদের কান্নাকাটিতে হাসপাতালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্ত্রী মারুফা আক্তার হাসপাতালের বারান্দায় বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। হাসপাতালে উপস্থিত প্রতিবেশী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেজাউল নেশা করতেন। তবে মাদক বিক্রি করতেন না। এসআই মহিউদ্দিন তাকে ফাঁসিয়েছেন।
স্ত্রী মারুফা বলেন, 'এসআই মহিউদ্দিন নির্যাতন করে আমার স্বামীকে হত্যা করেছেন। শনিবার রাতে স্বামীকে খাবার খাইয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরি। রেজাউল তখন তাকে বলেছিলেন, এসআই মহিউদ্দিন তাকে অমানুষিক নির্যাতন করেছেন। গভীর রাতে হাসপাতাল থেকে ফোন করে মৃত্যু সংবাদ জানানো হয়।'
রেজাউলের বাবা মো. ইউনুস সাগদরী বাজারের মাংস বিক্রেতা। দুই ছেলের মধ্যে ছোট আজিজুল করীম একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। বড় রেজাউল বরিশাল ল কলেজ থেকে আইন পাস করার পর বার কাউন্সিলের সনদের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ওবায়েদুল্লাহ সাজুর জুনিয়র হিসেবে কাজ করতেন বলে জানান রেজাউলের বন্ধু আতিকুল ইসলাম।
রেজাউলের বাবা মো. ইউনুস জানান, মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টার দিকে রেজাউল বাসা সংলগ্ন হামিদ খান সড়কের মুখে একটি চায়ের দোকানে বসা ছিল। এ সময় ডিবির এসআই মহিউদ্দিন মাইক্রোবাসে এসে রেজাউলের জামার কলার ধরে খানিক দূরে একটি অন্ধকার স্থানে গিয়ে বলে, 'আমারে দুটি ছেলে ধরিয়ে দে, আমার দুটি মামলা লাগবে।' রেজাউল অস্বীকার করলে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বলে, 'না হলে তোকেই ফাঁসিয়ে দেব।'
ইউনুস জানান, তিনিসহ অন্যরা ঘটনাস্থলে গেলে সেখানে জটলার সৃষ্টি হয়। এ সময় এসআই মহিউদ্দিন দুটি সিরিঞ্জ ও দুটি অ্যাম্পুল দেখিয়ে বলেন, নেশা জাতীয় এ ইনজেকশন রেজাউলের সঙ্গে পাওয়া গেছে। পরে তাকে তড়িঘড়ি করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে তারা গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে দেখা করতে চাইলে অনুমতি দেননি এসআই মহিউদ্দিন। শুক্রবার রাত পৌনে ১২টার দিকে বরিশাল কারাগার থেকে তাকে ফোন করে জানানো হয়, রেজাউল বাথরুমে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছে। তাকে শেবাচিম হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ খবরে ছোট ছেলে আজিজুল হাসপাতালে এসে রেজাউলকে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে পায়।
মৃত রেজাউলের ভাই আজিজুল বলেন, এসআই মহিউদ্দিন মাহি তার ভাইকে আটক করে নিয়ে আসার পর তাকে কোথায় রাখা হয়েছে, কখন থানা থেকে আদালতে পাঠিয়েছে বা কখন কারাগারে পাঠানো হয়েছে, কিছুই তাদের জানানো হয়নি। পরিবার থেকে বারবার যোগাযোগ করা হলে এসআই মহিউদ্দিন মাহি বলেছেন, রেজাউলকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
রেজাউলের বন্ধু আতিকুল ইসলামও শনিবার সার্বক্ষণিক হাসপাতালে ছিলেন। তিনি বলেন, রেজাউলের কোমরের নিচে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। রেজাউল তাকে বারবার বলেছে, সে বাঁচবে না। তাকে শনিবার তিন ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়।
তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন। তবে জানা গেছে, রক্তক্ষরণে রেজাউলের মৃত্যু হয়েছে বলে মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযুক্ত এসআই মহিউদ্দিন মাহিকে বারবার ফোন দেওয়া হলেও রিসিভ করেননি। বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক সাংবাদিকদের বলেন, গত বুধবার রেজাউলকে কারাগারে পাঠানো হয়। থানা থেকে দেওয়া কাগজপত্রে তার অসুস্থতার কথা লেখা ছিল। রেজাউলের পা থেকে রক্তক্ষরণ হওয়ায় শুক্রবার রাতে তাকে শেবাচিম হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ ব্যাপারে বরিশাল মহানগর পুলিশ কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান বলেন, মাদক মামলার আসামি রেজাউল অসুস্থ হয়ে শেবাচিম হাসপাতালের প্রিজন সেলে মারা গেছে। কীভাবে সে অসুস্থ হলো, তা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জানা যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, রক্তক্ষরণে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সে মাদকাসক্ত ছিল। ইনজেকশনের ক্ষতও রয়েছে তার শরীরে। স্বজনরা আবেগে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ আনতে পারেন। এসব অভিযোগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পুলিশের অনুসন্ধানকারী দল এ নিয়ে কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত নির্যাতনের কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ।
